কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে সানন্দা পাহাড় থেকে আজ বিকালে এক ১৩ বছর বয়সী ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। ছেলেটির নাম ইশিয়াত শাহরিয়ার অপরাজিত। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসান জানান, এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে তিন তরুণকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের নাম তুহিন, আনাস ও ফাহিম, বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। ওসি জানান, পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আজ রাত ৯টা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
"আমার তো একটাই ছেলে। এখন কার জন্য বাঁচব? ওরা আইফোনটা নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলল?" — নাহিদা বেগম, নিহতের মা
কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপরাজিত গতকাল বিকাল ৩টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়। সে বাবা-মাকে বলেছিল, মায়ের আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে যাচ্ছে। তার পরনে ছিল নীল পাঞ্জাবি। বাবা বলেন, "আমি তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু সে খুব উৎসাহী ছিল। সে বেরিয়ে গেল, আর ফিরল না।"
পরিবার তাকে খুঁজে বেড়িয়েও পায়নি। ওইদিনই বাবা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং মা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলের তথ্য জানতে পোস্ট দেন। পুলিশ সারা রাত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তাকে খোঁজে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক সভাপতি ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য মাহমুদুল হাসান রাহাত জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় — গতকাল বিকাল ৩টা ৭ মিনিটের দিকে অপরাজিত একজন তরুণের সঙ্গে সানন্দা পাহাড় এলাকার দিকে হেঁটে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ফুটেজ পর্যালোচনা করে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্ক্রিনশট দেখালে তাঁরা ওই তরুণকে চিহ্নিত করেন। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় মুদি দোকানদার জানান, সন্দেহভাজনদের একজন তুহিন অপরাজিতের বাড়ির আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেশ কয়েকবার মোটরসাইকেলে এসেছিলেন। তবে অপরাজিত নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁকে আর বাড়ির কাছে দেখা যায়নি।
আজ স্থানীয়রা সানন্দা পাহাড়ে অপরাজিতের মৃতদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে জানান। কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, পুলিশ দুপুর ১টার দিকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার এবং অপরাজিতের বাড়ি থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে।
পুলিশ বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ছেলে মৃত অবস্থায় পাওয়ার খবর শুনে নাহিদা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, "আমার তো একটাই ছেলে। এখন কার জন্য বাঁচব? ওরা আইফোনটা নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলল?"
বাবা বলেন, "সম্ভবত আইফোনটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল।" পুলিশ জানিয়েছে, ফোনটি এখনো উদ্ধার করা হয়নি। ছেলেটির মৃত্যু সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম এম শরিফুল করিম অপরাজিতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন, দায়ীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করেছে।