Focus Keyphrase:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের বড় পদক্ষেপ: ইনার মঙ্গোলিয়ায় গড়ে উঠছে বিশাল ডাটা সেন্টার
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীন। একদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে নিজের দেশে অবকাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে নজিরবিহীন গতিতে কাজ করে যাচ্ছে বেইজিং।
চীনের প্রশাসনিক এলাকা ইনার মঙ্গোলিয়ার উলানক্যাব (Ulanqab) অঞ্চলটি এতদিন মূলতঃ দেশের আলুর রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই বিশাল চারণভূমি ও কৃষি অঞ্চলের দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শত শত প্রকৌশলী ও নির্মাণ শ্রমিকের দিনরাত পরিশ্রমে এখানে তৈরি হচ্ছে একের পর এক বিশাল ডাটা সেন্টার।
ডাটা সেন্টারের নতুন হাব
চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স এবং ডিপসিক-এর মতো শীর্ষস্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য দেশটির বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত ডাটা সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। ইনার মঙ্গোলিয়া ছাড়াও নিংশিয়া, গানসু এবং কুইঝৌ প্রদেশেও এই ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
এই অঞ্চলগুলোকে বেছে নেওয়ার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলগত কারণ রয়েছে:
সস্তা জমি ও অনুকূল আবহাওয়া: প্রত্যন্ত অঞ্চলে জমির দাম কম এবং তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ডাটা সেন্টারের কুলিং সিস্টেমে পানির চাহিদা কম থাকে।
নবায়নযোগ্য শক্তি: বাতাস ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সবুজ শক্তির মাধ্যমে ডাটা সেন্টার পরিচালনার পরিকল্পনা করছে চীন।
বেইজিংয়ের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির ৯০ শতাংশ শিল্প ও নাগরিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন ঘটানো।
চিপ নিষেধাজ্ঞা ও ওপেন সোর্স কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চীন প্রযুক্তির বিকাশ থামিয়ে রাখেনি। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে তাদের উদ্ভাবন 'ক্লোজড মডেল' বা গোপন হিসেবে রাখে, সেখানে চীন সরকার তাদের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'ওপেন-সোর্স' মডেল তৈরিতে উৎসাহিত করছে।
এর মাধ্যমে সাশ্রয়ী ও উন্মুক্ত এআই মডেল তৈরি করে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে, যা মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞার বাধা কাটিয়ে উঠতে চীনকে সহায়তা করছে।
গবেষক ও প্রকৌশলীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
অবকাঠামোর পাশাপাশি মেধাবী জনশক্তি গড়ে তোলার দিকেও নজর দিয়েছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বর্তমানে অনেক তরুণ চীনা প্রকৌশলী ও গবেষক পশ্চিমা দেশ ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে আসছেন। জাতীয় গবেষণা অনুদান ও সরকারি সহায়তার কারণে এখন অনেকেই চীনে কাজ করার সুবিধা দেখছেন।
প্রতি বছর চীন প্রায় ৫০ লাখ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, যা বিশ্ববাজারে তাদের বিশাল মানবসম্পদের ভিত্তি প্রদান করে।
স্থানীয় প্রভাব ও সাধারণ মানুষের সামাজিক বাস্তবতা
এত বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্যেও স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে:
বিশাল ডাটা সেন্টারগুলোর জন্য এখনো কিছু বিদ্যুৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসছে, যা পরিবেশবান্ধব লক্ষ্যমাত্রার সাথে পুরোপুরি মেলে না।
অনেক জায়গায় জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের ফলে স্থানীয় কৃষক ও ভেড়া পালনকারীদের দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হচ্ছে।
নতুন ডাটা সেন্টারগুলো স্থানীয় সাধারণ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়েও স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
তা সত্ত্বেও, চীন সরকার এআই প্রযুক্তিকে তাদের দ্রুত বয়স্ক হতে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিকল্প হিসেবে দেখছে। ম্যানুফ্যাকচারিং ও উৎপাদন খাতে অটোমেশনের দ্রুত প্রয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শীর্ষে রাখাই বেইজিংয়ের মূল কৌশল।