
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে Hussain Muhammad Ershad এমন একটি নাম, যাকে ঘিরে আজও বিতর্ক থেমে নেই। কেউ তাকে সামরিক শাসক ও স্বৈরাচারের প্রতীক হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন—তিনি ছিলেন এমন এক রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল, যেখানে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামো ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। প্রশ্ন হলো—এরশাদ কি একাই স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিলেন, নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই তাকে সেই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল?
বাংলাদেশের সংবিধান ও তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রেক্ষাপটে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয়বাদী ধারণার আলোচনায় জনগণের একাংশের কাছে ‘স্বৈরাচার’ উপাধিতে পরিচিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন—এমন মত অনেকের মধ্যে বিদ্যমান। তবে তাঁর সমর্থকদের মতে, বাস্তবতায় তিনি কেবল ক্ষমতার প্রতীক ছিলেন না; বরং গ্রামীণ উন্নয়ন, স্থানীয় প্রশাসন শক্তিশালীকরণ এবং জনমুখী বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তিনি ‘পল্লীবন্ধু’ হিসেবে মানুষের কাছে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাই তাদের দৃষ্টিতে এরশাদের রাজনৈতিক পরিচয় কেবল বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং উন্নয়ন ও জনগণকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার পথ কখনোই পুরোপুরি স্থিতিশীল ছিল না। রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অপরিণত চর্চা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার পরীক্ষার মুখে পড়ে। এমন বাস্তবতায় ১৯৮২ সালে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। এই ক্ষমতা গ্রহণ ছিল নির্বাচনী জনরায়ের বাইরে, ফলে শুরু থেকেই তার শাসন নিয়ে বৈধতার প্রশ্ন তৈরি হয়।
তার সমালোচকেরা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা—এসবই স্বৈরশাসনের বৈশিষ্ট্য। সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও তার সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। ফলে জনমনে “স্বৈরাচার” পরিচয়টি রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি পাঠও আছে। কোনো ব্যক্তি একা রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, যদি না রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রশাসন, রাজনৈতিক শক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে সেই সুযোগ দেয়। সংবিধান মূলত ক্ষমতা সীমিত করার দলিল। কিন্তু যখন সংবিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, যখন ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়—তখন একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে।
এই জায়গায় এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—সংবিধান কি কাউকে স্বৈরাচার বানায়? সরাসরি নয়। সংবিধান কোনো ব্যক্তিকে স্বৈরশাসক হওয়ার অনুমতি দেয় না। কিন্তু সংবিধানের দুর্বল প্রয়োগ, রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট, জবাবদিহিতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীরবতা এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে একজন শাসক ক্রমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
এরশাদের সময় কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়—এমন যুক্তিও তার সমর্থকেরা তুলে ধরেন। কিন্তু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ কোনো শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড নয়। একটি রাষ্ট্র কতটা অংশগ্রহণমূলক, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের ভোটাধিকার কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই Hussain Muhammad Ershad–কে কেবল “ভালো” বা “খারাপ”, “স্বৈরাচার” বা “নায়ক”—এই দুই মেরুতে বিচার করলে ইতিহাসের গভীরতা হারিয়ে যায়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন একটি রাষ্ট্রে বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে ছাড়িয়ে যায়? কেন সংবিধানের চেয়ে ক্ষমতার বাস্তবতা বড় হয়ে ওঠে? এবং কেন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়?
ইতিহাসের শিক্ষা হলো—স্বৈরাচার কেবল একজন মানুষের সৃষ্টি নয়; অনেক সময় তা রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, রাজনৈতিক আপস, প্রশাসনিক নীরবতা এবং সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফল। একজন ব্যক্তি সেই সুযোগ ব্যবহার করেন, কিন্তু সুযোগটি তৈরি হয় বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে।
সুতরাং, এরশাদকে বোঝার আলোচনায় ব্যক্তি ও ব্যবস্থাকে আলাদা করা কঠিন। রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারে, তবে ব্যক্তি বদলালেও ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না। আর সেখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—রাষ্ট্র যেন কখনো কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]