স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
কুরবানির ঈদ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু এই ঈদের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচার বা পশু কুরবানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মত্যাগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা, কর্তব্যবোধ ও বৃহত্তর কল্যাণের দর্শন। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র— এই ধারাবাহিক নির্মাণের ভেতর কুরবানির শিক্ষা একটি নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। সেই অর্থে কুরবানির ঈদকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোয়ও দেখার সুযোগ রয়েছে।
কুরবানির মূল শিক্ষা এসেছে আনুগত্য ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন আমাদের শিখিয়েছে যে প্রকৃত কুরবানি মানে নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, সংকীর্ণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ত্যাগ করা। এই শিক্ষা ব্যক্তি জীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনেও তা সমান অর্থবহ। কারণ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল আইন, প্রশাসন বা অবকাঠামো দিয়ে গড়ে ওঠে না; রাষ্ট্র গড়ে ওঠে দায়িত্ববান, নৈতিক ও আত্মনিয়ন্ত্রিত নাগরিকদের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তায় নাগরিকের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ব্যক্তি শুধু নিজের জন্য বাঁচে না; সে সমাজ, সংস্কৃতি, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকে। কুরবানির ঈদ সেই দায়বদ্ধতার শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ যখন নিজের ভোগের বাইরে গিয়ে অন্যের প্রয়োজনের কথা ভাবে, নিজের সামর্থ্য থেকে ভাগ করে নেয়, তখন সেখানে সামাজিক ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতির বীজ রোপিত হয়।
আজকের সময়ে আমরা প্রায়ই অধিকারের কথা বলি, কিন্তু কর্তব্যের কথা কম বলি। অথচ রাষ্ট্র কেবল দাবি দিয়ে টিকে থাকে না; রাষ্ট্র টিকে থাকে দায়িত্ব পালন, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর। কুরবানির ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— একজন ভালো নাগরিক হওয়া এক ধরনের ইবাদতও হতে পারে, যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের কল্যাণ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন।
রাষ্ট্রীয় চেতনার অর্থ অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং আইনকে সম্মান করা, জনসম্পদকে রক্ষা করা, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সম্মিলিত উন্নয়নের জন্য কাজ করা। যে নাগরিক নিজের ভেতরে শুদ্ধতা আনে, সে রাষ্ট্রের জন্যও ইতিবাচক শক্তি হয়ে ওঠে। তাই আত্মশুদ্ধি ও রাষ্ট্রগঠন— এই দুইয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করেই থেমে যাব না; বরং নিজেদের চরিত্রে পরিবর্তন আনবো। আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করি— অসততা ত্যাগ করবো, দায়িত্বশীল হবো, সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমর্থন করবো, কর্মে সততা আনবো এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবো— তবে সেই কুরবানি ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য অর্থবহ হয়ে উঠবে।
এবারের কুরবানির ঈদে আমাদের অঙ্গীকার হোক— আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এমন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবো, যারা নৈতিকতায় দৃঢ়, দায়িত্বে সচেতন এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় নিবেদিত। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি হবে আমাদের অন্তরের পরিবর্তনের সূচনা; আর সেই পরিবর্তন থেকেই জন্ম নেবে আরও সচেতন, সুশৃঙ্খল ও কল্যাণমুখী সমাজ ও রাষ্ট্র।