
বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিলতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কেবল ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডিতে আক্রান্ত হয়েই বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা বৈশ্বিক মোট মৃত্যুর প্রায় ৬ শতাংশ।
আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, ‘বিশ্ব ফুসফুস দিবস’। ফুসফুসের সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘এ লাইফটাইম অব লাং হেলথ’ (আজীবন ফুসফুসের স্বাস্থ্য)।
‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩’-এর তথ্য বলছে, দেশে মৃত্যুর শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে দুটিই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ।
চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসের স্বাস্থ্য অবহেলার অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান। এছাড়া তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার ফুসফুসের ক্যানসার, সিওপিডি, যক্ষ্মা ও অ্যাজমার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন:
সিওপিডি: বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ সিওপিডি। ২০২৩ সালে এ রোগে প্রায় ৩৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
হাঁপানি (অ্যাজমা): বৈশ্বিকভাবে প্রায় ৩৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অ্যাজমায় আক্রান্ত। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। এ রোগে বছরে মারা যাচ্ছেন সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ।
যক্ষ্মা: ২০২৪ সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং এর মধ্যে মারা যান ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৩.৬ শতাংশই বাংলাদেশের।
ফুসফুসের ক্যানসার: বৈশ্বিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ‘গ্লোবোক্যান’-এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালে বিশ্বে ২৬ লাখ নতুন ফুসফুসের ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৯ লাখ মানুষ মারা যান। এটি ক্যানসারে মৃত্যুর শীর্ষ কারণগুলোর একটি।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. ফকির ওয়ালিদ শাহ জানান, শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় গৃহীত অক্সিজেন ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলি ‘অ্যালভিওলাই’-এর মাধ্যমে রক্তে মিশে যায় এবং রক্ত থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের হয়ে আসে।
তিনি বলেন, "ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শুধু শ্বাসকষ্টই হয় না; বরং হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও পেশিসহ পুরো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই সুস্থ জীবনের জন্য তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।"
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান 'প্রজ্ঞা' (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-র তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন রোগে মারা যান। বর্তমানে দেশে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের সতর্ক করে বলেন, "প্রচলিত তামাকের পাশাপাশি ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো ক্ষতিকর পণ্যের প্রতি কিশোর ও তরুণদের আকর্ষণ মারাত্মক হারে বাড়ছে। ফুসফুস রক্ষায় দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধূমপান বর্জন, বায়ুদূষণ রোধ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার মাধ্যমেই কেবল এই বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।