
স্তন ক্যানসার কি শুধু টিউমার হলেই হয়? চাকা ছাড়াও যে ৫ লক্ষণে সতর্ক হওয়া জরুরি
দশকের পর দশক ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত—স্তন ক্যানসারের একমাত্র বা প্রধান লক্ষণ হলো স্তনে কোনো শক্ত চাকা বা টিউমার থাকা।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্তন ক্যানসারের এমন অনেক লক্ষণ রয়েছে, যেগুলোতে স্তনে দৃশ্যমান কোনো চাকা তৈরি হয় না। ফলে ‘চাকা নেই মানে ক্যানসার নেই’—এমন ধারণা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সের ‘সিটি অব হোপ’ ক্যানসার সেন্টারের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ড. সিনথিয়া লিঞ্চ জানান, হাত কোমরে রেখে বা ওপরের দিকে তুলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে স্তন পরীক্ষা করলে শরীরের বেশ কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়ে, যা প্রাথমিক পর্যায়েই ক্যানসার শনাক্তে সাহায্য করতে পারে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তনে কোনো চাকা বা টিউমার ছাড়াও ক্যানসারের যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
নিপলের আশপাশে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, আগে স্বাভাবিক থাকা নিপল যদি হঠাৎ করে পেছনের দিকে বা স্তনের ভেতরের দিকে ঢুকে যায় (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নিপল রিট্রাকশন’ বলা হয়), তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়ায় হালকা কোনো স্তন নিঃসরণ হতে পারে, তবে কোনো চাপ দেওয়া ছাড়াই যদি নিপল থেকে অস্বাভাবিক, রক্তমিশ্রিত বা অনবরত তরল বের হতে থাকে—যা পোশাকে দাগ ফেলে—তবে তা ক্যানসারের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
স্তনের ত্বক হঠাৎ কুঁচকে যাওয়া বা মোটা হয়ে যাওয়া একটি বিপজ্জনক সংকেত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘পো ডিঅরেঞ্জ’ (Peau d'orange) বলা হয়।
এটি ‘ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যানসার’ (IBC) নামক এক ধরনের বিরল কিন্তু অত্যন্ত আক্রমণাত্মক স্তন ক্যানসারের লক্ষণ। এই ধরনের ক্যানসারে কোনো শক্ত চাকা থাকে না এবং অনেক সময় সাধারণ ম্যামোগ্রামেও এটি ধরা পড়ে না। এর পাশাপাশি স্তনে চুলকানি, লালচে ভাব, স্তন অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হওয়া কিংবা এক স্তন অন্যটির চেয়ে হঠাৎ বড় বা ভারী লাগার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
নিপলের চারপাশে লালচে হওয়া, আঁইশের মতো চামড়া ওঠা বা খোসা ওঠা এবং সেখানে না সারা ঘা দেখা দিলে তা ‘প্যাজেটস ডিজিজ অব দ্য ব্রেস্ট’ (Paget's Disease)-এর লক্ষণ হতে পারে। এটি স্তন ক্যানসারের এমন একটি রূপ, যা স্তনের গভীরের নালী থেকে শুরু হয়ে নিপলের ত্বকে এসে প্রকাশ পায়।
কখনো কখনো স্তনে কোনো দৃশ্যমান চাকা বা শারীরিক পরিবর্তন বোঝা যায় না, তবে বগলে বা কলারবোনের (ঘাড়ের নিচের অংশ) চারপাশে ফোলা ভাব বা লিফম নোড ফুলে উঠতেই দেখা যায়। এর অর্থ হতে পারে, ক্যানসার কোষগুলো আগেই লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, স্তনে কোনো চাকা না থাকা সত্ত্বেও ব্যথা হতে পারে, যাকে বলা হয় ‘মাসট্যালজিয়া’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি মাসিকের হরমোনজনিত পরিবর্তন, গর্ভাবস্থা বা সাধারণ কোনো প্রদাহের কারণে হয়।
কেবল ব্যথাই স্তন ক্যানসারের প্রধান লক্ষণ নয়, তবে ব্যথা যদি ক্রমাগত এক জায়গায় থাকে বা বাম স্তনে ব্যথার সাথে অন্যান্য শারীরিক জটিলতা অনুভব হয়, তবে হৃদরোগের সম্ভাবনা এড়িয়ে যেতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিয়মিত নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ বা অনকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।