মৃত্যুকে যেন বারবার অতি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেও নতুন জীবন উপহার পেয়েছেন এক অদম্য নারী। শৈশবে চিকিৎসকদের আশাহীন ঘোষণা সত্ত্বেও প্রাণঘাতী যক্ষ্মা রোগ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে সমুদ্রের ভয়াল সব দুর্ঘটনা জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইতিহাসের এক বিস্ময়কর চরিত্র হিসেবে। তাঁর নাম ভায়োলেট জেসপ—ইতিহাস যাঁকে চেনে ‘মিস আনসিংকেবল’ (Miss Unsinkable) বা অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা অপরাজেয় নারী হিসেবে।
আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণকারী আইরিশ বংশোদ্ভূত ভায়োলেট জেসপের শৈশব থেকেই শুরু হয়েছিল বেঁচে থাকার যুদ্ধ। ছোটবেলায় তিনি মরণঘাতী যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা সে সময় তাঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে পরিবারকে সাহায্য করতে তিনি সমুদ্রে জাহাজের ক্রু ও নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৯১১ সালে ভায়োলেট জেসপ 'হোয়াইট স্টার লাইন' কোম্পানির বিলাসবহুল জাহাজ আরএমএস অলিম্পিক (RMS Olympic)-এ স্টুয়ার্ডেস হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বছরই সমুদ্রযাত্রা চলাকালে এটি একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ 'এইচএমএস হক'-এর সাথে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। জাহাজটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে থাকতে সক্ষম হয় এবং ভায়োলেট জেসপ কোনো আঘাত ছাড়াই নিরাপদে ফিরে আসেন।
অলিম্পিক দুর্ঘটনার ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯১২ সালে, ভায়োলেট জেসপ স্থানান্তরিত হন ইতিহাসখ্যাত আরএমএস টাইটানিক (RMS Titanic)-এ। ওই বছরের ১৪ এপ্রিল রাতে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে বিশাল এক বরফখণ্ডের (Iceberg) সাথে ধাক্কা লেগে বিখ্যাত জাহাজটি ডুবে যায়।
হিমশীতল জলের সেই করুণ রাতে ভায়োলেটকে একটি শিশুর দায়িত্ব দিয়ে ১৬ নম্বর লাইফবোটে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় ১৫০০ মানুষের সলিল সমাধি হলেও তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং 'কার্পেথিয়া' জাহাজের মাধ্যমে ডাঙ্গায় ফেরেন।
টাইটানিকের বীভৎস অভিজ্ঞতাও তাঁকে সমুদ্র থেকে দূরে রাখতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রেড ক্রসের নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেন টাইটানিকের জমজ জাহাজ এইচএমএইচএস ব্রিটানিক (HMHS Britannic)-এ। ১৯১৬ সালে এজিয়ান সাগরে চলাচলের সময় একটি সমুদ্র মাইন বিস্ফোরণে মাত্র ৫৫ মিনিটের মধ্যে ব্রিটানিক সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যায়।
জাহাজটি যখন ডুবছিল, তখন প্রোপেলারের ঘূর্ণিতে লাইফবোট ভেঙে ধ্বংস হতে থাকলে ভায়োলেট লাফ দেন সমুদ্রে। মাথায় তীব্র আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও জল থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। পর পর তিনটি মহাসামুদ্রিক বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফিরে ইতিহাসের পাতায় তিনি নিজের নাম খোদাই করে নেন ‘আনসিংকেবল নারী’ হিসেবে।
| জাহাজের নাম | সাল | দুর্ঘটনার ধরন | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| আরএমএস অলিম্পিক | ১৯১১ | যুদ্ধজাহাজ 'এইচএমএস হক'-এর সঙ্গে ধাক্কা। | অক্ষত অবস্থায় রক্ষা। |
| আরএমএস টাইটানিক | ১৯১২ | হিমশৈলের (Iceberg) আঘাতে সলিল সমাধি। | ১৬ নং লাইফবোটে জীবিত উদ্ধার। |
| এইচএমএইচএস ব্রিটানিক | ১৯১৬ | সমুদ্র মাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। | মাথায় আঘাতসহ অলৌকিক বেঁচে ফেরা। |