
কয়েক মাস ধরে ১৬ বছরের কিশোরী মেহরিনের মাসিক ঠিকমতো হচ্ছে না। কখনো এক মাস বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। তার মুখে ব্রণের উপদ্রব বেড়েছে, থুতনিতে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক লোম এবং এর সঙ্গেই দ্রুত বাড়ছে ওজন। বয়সন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে শুরুতে বিষয়টিকে মেহরিনের পরিবার তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা নয়—মেহরিন মূলত ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম’ বা পিসিওএস (PCOS)-এ আক্রান্ত।
মেহরিনের উদাহরণটি কাল্পনিক হলেও, এটি বর্তমানে বাংলাদেশের হাজারো কিশোরীর জীবনের বাস্তব চিত্র। বয়সন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক সময় এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো আড়ালে পড়ে যায়। অনিয়মিত মাসিক, ব্রণের সমস্যা, শরীরে অতিরিক্ত লোম বা দ্রুত ওজন বাড়ার বিষয়গুলোকে পরিবার ও সমাজ গুরুত্ব না দেওয়ায় সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
পিসিওএস ও এর নতুন বৈশ্বিক নাম
পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) প্রজননক্ষম নারীদের একটি অন্যতম প্রধান ও জটিল হরমোনজনিত সমস্যা। সম্প্রতি এই রোগের পরিধি ও বিপাকীয় প্রভাব বিবেচনা করে এর নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে পিসিওএসের নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম’ (PMOS)।
বিশ্বজুড়ে প্রজনন বয়সের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। এটি মূলত শরীরের ‘হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-ওভারিয়ান অক্ষ’-এর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে অনিয়মিত মাসিক বা মাসিক বন্ধ থাকার পাশাপাশি শরীরে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রভাব বাড়ে, যার প্রকাশ ঘটে অবাঞ্ছিত লোম ও ব্রণের মাধ্যমে। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে বন্ধ্যাত্ব এবং জরায়ুর ক্যানসারের ঝুঁকিও যুক্ত থাকে।
এক নজরে পিসিওএস (PCOS / PMOS)-এর প্রধান উপসর্গ:
দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত থাকা বা বন্ধ থাকা
মুখে ও শরীরে অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত লোম গজানো (হিরসুটিজম)
থুতনি ও গালে তীব্র ব্রণের উপদ্রব
দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পাওয়া এবং তা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়া
ভিটামিন ডি ও বিপাকীয় জটিলতা: বাংলাদেশের গবেষণা চিত্র
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএসের তীব্রতার সঙ্গে শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ভিটামিন ডি কেবল হরমোন নিঃসরণ নয়, বরং ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে পিসিওএসে আক্রান্ত ১৭৫ জন কিশোরীর (গড় বয়স ১৬.৮ বছর) ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে:
| বিপাকীয় ও পুষ্টিগত সূচক | আক্রান্ত কিশোরীদের হার |
| ভিটামিন ডি-এর তীব্র ঘাটতি | ৯২.৬% |
| ডিসলিপিডেমিয়া (রক্তে চর্বির ভারসাম্যহীনতা) | ৯০.৯% |
| মেটাবলিক সিনড্রোম (বিপাকীয় জটিলতা) | ৪২.৩% |
| গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের পূর্বাভাস) | ২৪.০% |
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০ জন পিসিওএস আক্রান্ত কিশোরীর মধ্যে প্রায় ৯ জনের শরীরেই ভিটামিন ডি-এর স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশের অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএস আক্রান্ত রোগীদের ৪২ শতাংশের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং ১৫.৩ শতাংশের ক্ষেত্রে মেটাবলিক সিনড্রোম বিদ্যমান।
চিকিৎসা ও পরিবারের করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিসিওএসের চিকিৎসা কেবল মাসিক নিয়মিত করার কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর বয়স, উপসর্গ, শারীরিক ওজন এবং বিপাকীয় ঝুঁকি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়।
শারীরিক চর্চা ও জীবনযাত্রা: সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম পিসিওএস ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।
ভিটামিন ডি সেবন: রক্তে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় তা পূরণ করা প্রয়োজন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ দায়িত্বে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণ করা মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
খোলামেলা পারিবারিক পরিবেশ: বয়সন্ধিকালে কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে পরিবারে খোলামেলা আলোচনার আবহ তৈরি করতে হবে।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদল: ‘মোটা হয়ে গেছ’ কিংবা চেহারা নিয়ে সামাজিক টিপ্পনী কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম প্রভাব ফেলে। পিসিওএস কোনো অপরাধ বা স্থায়ী পরিচয় নয়—এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা।
সঠিক তথ্য, সহানুভূতিশীল পারিবারিক পরিবেশ এবং সময়মতো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেলে পিসিওএস সামলে নিয়ে একজন কিশোরী স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে।