
কথাবার্তা বলার সময় বা গল্প করার মুহূর্তে ছোট শিশুরা প্রায়ই বাবা-মায়ের গালে হাত দেয়, থুতনি ধরে, ভ্রু স্পর্শ করে কিংবা নাকে আলতো করে টোকা দেয়। অনেক অভিভাবক এটিকে কেবল শিশুর চঞ্চলতা বা দুষ্টুমি হিসেবে দেখলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
শিশুমনোবিজ্ঞান ও বিকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা বলছে, শিশুদের এই আচরণের মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ, মনোযোগ ধরে রাখা, নিরাপত্তা খোঁজা কিংবা যোগাযোগ জোরদার করার মতো বিষয়টি জড়িয়ে থাকতে পারে।
তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে এই আচরণের অর্থ যে একই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে তৎকালীন পরিস্থিতি এবং শিশু ও অভিভাবকদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।
‘সায়েন্স ডিরেক্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘রিভিউ অব রিসার্চ অন সোশ্যাল টাচ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষ গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে মানুষের যোগাযোগ কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
গবেষকদের মতে, স্পর্শ মানুষের সামাজিক শিখন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জীবনের শুরুর দিকে যখন শিশুর মস্তিষ্ক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে, তখন শারীরিক স্পর্শ তার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
কথা বলার সময় বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ করার একটি অর্থ হতে পারে—শিশু শারীরিকভাবে কাছে থেকে যোগাযোগের ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে চাইছে।
শিশুর কাছে বাবা-মায়ের মুখমণ্ডল হলো আবেগ ও সামাজিক তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস। মা হাসছেন কি না, বাবা তার কথায় মনোযোগ দিচ্ছেন কি না—এসব বিষয় শিশু মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বোঝার চেষ্টা করে।
অনেক সময় অভিভাবক যখন অন্য কোনো কাজে (যেমন ফোনে কথা বলা বা রান্না করা) ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশু কাছে এসে মুখে হাত দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি মুখে বলতে না পেরে শিশু হয়তো এই শারীরিক আচরণের মাধ্যমে অভিভাবকদের মনোযোগ নিজের দিকে আনার চেষ্টা করে।
অভিভাবকের স্পর্শ যে শিশুর সামাজিক উদ্বেগ ও ভয় কমায়, তা একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশ্বস্ত অভিভাবকের স্পর্শ শিশুর মধ্যে এক ধরনের সুরক্ষাবলয় তৈরি করে, যা তাকে মানসিকভাবে শান্ত রাখে।
আবার সব সময় জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ নাও থাকতে পারে। অনেক সময় বাবা-মায়ের গালের নরম অনুভূতি কিংবা ভ্রু ও নাকের স্পর্শ শিশুর কাছে মজার মনে হয়। অর্থাৎ কেবল ভালোবাসার নিজস্ব ভঙ্গি বা কৌতূহলবশত অভ্যাসের অংশ হিসেবেও সে এমনটি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শিশু যদি আলতোভাবে মুখ স্পর্শ করে এবং তাতে অস্বস্তি না হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে থামানোর প্রয়োজন নেই। তবে একই সঙ্গে শিশুকে শারীরিক সীমারেখা (Personal Space) সম্পর্কে ধারণা দেওয়াও জরুরি।
পরিস্থিতি বুঝুন: শিশু কেন এমন করছে—সে কি ক্লান্ত, নাকি আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
সীমা নির্ধারণ করুন: শিশু যদি চোখে আঙুল দেয় বা অসাবধানতাবশত ব্যাথা দেয়, তবে শান্তভাবে তাকে বলুন: “তুমি আমার মুখ স্পর্শ করতে পারো, তবে খুব আলতো করে।” অথবা “তুমি চাইলে এখন আমার হাত ধরে রাখতে পারো।”
এর মাধ্যমে শিশু যেমন ভালোবাসার উষ্ণতা পাবে, তেমনই অন্যের শরীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেও শিখবে।