
পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়া বা মলদ্বারের কাছে মাংসপিণ্ড অনুভূত হওয়ার সমস্যায় অনেকেই লজ্জা বা ভয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। ফার্মেসি থেকে নিজে ওষুধ কিনে খাওয়া, কবিরাজি চিকিৎসা বা তথাকথিত "গ্যারান্টিড" অপচিকিৎসার শরণাপন্ন হওয়ার কারণে জটিলতা আরও বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, পাইলস বা হেমোরয়েড অত্যন্ত সাধারণ একটি রোগ হলেও মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের একমাত্র কারণ এটি নয়। সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় না হলে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধিও অনাবিষ্কৃত থেকে যেতে পারে।
পায়ুপথের ভেতরের রক্তনালির গুচ্ছ ফুলে উঠলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হেমোরয়েড’ বা প্রচলিত ভাষায় পাইলস বলা হয়। এটি প্রধানত দুই ধরনের:
ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) পাইলস: এতে সাধারণত মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত হয়। রোগের মাত্রা বাড়লে পাইলসের অংশ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।
এক্সটারনাল (বহিঃস্থ) পাইলস: এতে মলদ্বারের বাইরের অংশে গুটি ও তীব্র ব্যথা দেখা দেয়, বিশেষ করে রক্ত জমাট বাঁধলে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, টয়লেটে অতিরিক্ত সময় বসে থাকা, মলত্যাগে বেশি চাপ দেওয়া, খাবারে ফাইবারের ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন এবং গর্ভাবস্থা পাইলসের প্রধান কারণ।
"অনেকের ধারণা ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই পাইলস হয়—এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ঝাল খাবার জ্বালাপোড়া বাড়ালেও পাইলস সৃষ্টির একমাত্র কারণ নয়।" — ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান, সহকারী অধ্যাপক (সার্জারী বিভাগ), আলোক হাসপাতাল।
মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়ার পেছনে পাইলস ছাড়াও একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকতে পারে:
অ্যানাল ফিশার: মলদ্বারে ফাটল বা ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া।
পলিপ: অন্ত্রের ভেতরে অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি।
কোলোরেক্টাল ক্যানসার: বৃহদন্ত্র বা মলদ্বারের ক্যানসার, যার প্রারম্ভিক লক্ষণ অনেক সময় পাইলসের মতো মনে হতে পারে।
পাইলস নিজে ক্যানসারে রূপান্তরিত হয় না, তবে দুটি রোগের উপসর্গ একই হওয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া বিপজ্জনক।
বাংলাদেশে এখনো অনেকে অপচিকিৎসকদের প্রলোভনে পড়ে মলদ্বারে ক্ষয়কারী পদার্থ বা অজানা পাউডার ব্যবহার করেন। এর ফলে পোড়া ক্ষত, তীব্র সংক্রমণ এবং মলদ্বারের টিস্যু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অপচিকিৎসার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—মূল মারাত্মক রোগটি শনাক্ত হতে বিলম্ব হওয়া।
সব পাইলসে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও কিছু সতর্কতায় এটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব:
খাদ্যাভ্যাস: খাদ্যতালিকায় ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্য) এবং পর্যাপ্ত পানি অন্তর্ভুক্ত রাখা।
টয়লেট অভ্যাস: টয়লেটে মোবাইল ব্যবহার করে অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না করা এবং অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া।
চিকিৎসা পদ্ধতি: ওষুধের পাশাপাশি রাবার ব্যান্ড লিগেশন বা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিক উপায়ে এর স্থায়ী চিকিৎসা সম্ভব।
বারবার বা অতিরিক্ত পরিমাণে রক্তপাত হলে
পায়খানা কালো হলে কিংবা আচমকা ওজন কমে গেলে
মলদ্বারে তীব্র ব্যথা, জ্বর বা নতুন গুটি দেখা দিলে
মলত্যাগের অভ্যাসে হঠাৎ কোনো বড় পরিবর্তন এলে
লজ্জা বা ভয় না পেয়ে প্রাথমিক অবস্থাতেই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই রোগ নিরাময়ের নিরাপদ পথ।
লেখক
ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান
সহকারী অধ্যাপক, সার্জারী বিভাগ
আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬