
মাথায় চিরুনি চালালেই কি থোকা থোকা চুল উঠে আসছে? কিংবা বালিশে বা গোসলখানার ড্রেনে আগের চেয়ে বেশি চুল জমতে দেখছেন? এমন পরিস্থিতিতে প্রথম চিন্তাটিই সাধারণত আসে প্রসাধনী বা শ্যাম্পু বদলে ফেলার।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চুল পড়া স্রেফ চুল বা ত্বকের বাহ্যিক সমস্যা নাও হতে পারে। অনেক সময় এটি শরীরের ভেতরের কোনো অন্তর্নিহিত রোগ বা হরমোনের অসামঞ্জস্যতার বড় সংকেত হয়ে দেখা দেয়।
মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার তালিকায় চুল কোনো অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ নয়। ফলে শরীর যখন পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের ওঠানামা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়, তখন সে তার প্রাণরক্ষাকারী অঙ্গ ও রক্তের স্বাভাবিক সঞ্চালনাকে অগ্রাধিকার দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চুলের ওপর, যার ফলে বন্ধ বা ধীর হয়ে যেতে পারে চুলের বৃদ্ধি।
চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি, হরমোনের সঠিক ভারসাম্য এবং মসৃণ রক্তসঞ্চালন। এসবের যেকোনো একটি ব্যাহত হলেই শুরু হতে পারে চুল পড়া।
শরীরে বড় ধরনের কোনো ব্যাধি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠার আগেই চুল পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, প্রধানত যেসব শারীরিক সমস্যার কারণে চুল পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে:
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। থাইরয়েড হাইপার (অতিরিক্ত কার্যকর) বা হাইপো (কম কার্যকর)—যে অবস্থাই হোক না কেন, হরমোনের ভারসাম্যের এই তারতম্য চুলের ফলিকলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে চুল দ্রুত পাতলা হতে শুরু করে।
শরীরের প্রতিটি টিস্যুতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে হিমোগ্লোবিন, যার মূল উপাদান আয়রন। রক্তে বা শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে অ্যানিমিয়া হতে পারে, যা চুলের বৃদ্ধিতে বড় বাধা তৈরি করে। দীর্ঘ দিন ধরে চুল পড়ার সাথে শরীরে সবসময় ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হলে রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি।
নারীদের ক্ষেত্রে 'পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম' (PCOS) চুল পড়ার অন্যতম বড় কারণ। এই অবস্থায় শরীরে অ্যান্ড্রোজেন বা পুরুষ হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এর ফলে মাথায় চুল পাতলা হতে থাকে, অন্যদিকে শরীরের অন্যান্য অংশে অস্বাভাবিক লোমের আধিক্য দেখা যায়। সাথে অনিয়মিত মাসিক ও ব্রণের সমস্যা থাকলে হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যখন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজ কোষ বা চুলের ফলিকলকেই আক্রমণ করে বসে, তখন তাকে অটোইমিউন সমস্যা বলা হয়। 'অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটা' নামক অবস্থায় মাথার নির্দিষ্ট অংশ থেকে গোলাকার হয়ে হঠাৎ চুল উঠে যায়। এ ছাড়া 'লুপাস'-এর মতো অটোইমিউন ব্যাধিতেও হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়তে পারে।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ফলে শরীরের প্রান্তীয় রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মাথার ত্বকে রক্তপ্রবাহ ও পুষ্টি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায়।
এ ছাড়া ভিটামিন ডি, জিঙ্ক, বায়োটিন ও প্রোটিনের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি থাকলেও চুল পড়া বাড়ে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কোনো ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া অনুচিত; কারণ মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিনও চুলের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও টেলোজেন এফ্লুভিয়াম
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অস্ত্রোপচার বা বড় কোনো অসুস্থতার প্রায় দুই থেকে তিন মাস পর হঠাৎ বেশি পরিমাণে চুল পড়তে শুরু করতে পারে। চিকিৎসার ভাষায় একে বলা হয় টেলোজেন এফ্লুভিয়াম (Telogen Effluvium)। সময়ের ব্যবধানের কারণে অনেকেই পেছনের মানসিক চাপ বা শারীরিক অসুস্থতার সাথে বর্তমান চুল পড়ার সম্পর্ক মেলাতে পারেন না।
হঠাৎ করে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চুল ঝরতে শুরু করলে।
মাথার ত্বকে হঠাৎ গোলাকার ফাঁকা ছোপ বা টাক দেখা দিলে।
চুল পড়ার সাথে অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ক্লান্তি, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমা কিংবা ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়লে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল পড়ার আসল কারণ যদি অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যাধি হয়, তবে দামি শ্যাম্পু বা বাইরে থেকে তেলমেখে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। মূল রোগের চিকিৎসা এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করাই এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ।