
যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস (টিবি) এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় সংক্রামক রোগ। চিকিৎসাযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য হলেও প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং মারা যান।
বিশেষ করে ফুসফুসের সক্রিয় যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে যক্ষ্মা নিয়ে আতঙ্কের চেয়ে রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং সময়মতো পরীক্ষা-চিকিৎসাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। একই বছরে এ রোগে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের।
বিশ্বের যক্ষ্মা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশও উচ্চঝুঁকির দেশগুলোর একটি।
ফুসফুসের সক্রিয় যক্ষ্মা প্রধানত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি, কথা বলা বা হাসার সময় বাতাসে যক্ষ্মার জীবাণু ছড়াতে পারেন।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে একই ঘর বা কম বায়ু চলাচলকারী জায়গায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু থাকলেই একজন ব্যক্তি অন্যকে সংক্রমিত করবেন—এমন নয়। সুপ্ত যক্ষ্মা সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত রোগী অন্যের মধ্যে জীবাণু ছড়ান না। সংক্রমণের ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগ থাকে সক্রিয় ফুসফুসের যক্ষ্মা নিয়ে।
সাধারণ সর্দি-কাশির মতো যক্ষ্মা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে না। সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগের ধরন, তার সঙ্গে কতক্ষণ ও কতটা কাছাকাছি থাকা হচ্ছে এবং পরিবেশে বায়ু চলাচল কেমন—এসব বিষয়ের ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাবিহীন সক্রিয় যক্ষ্মা রোগী দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা কয়েকজন মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন। তবে এই সংখ্যা সবার ক্ষেত্রে একই হবে না।
না। দীর্ঘস্থায়ী কাশি বিভিন্ন রোগের কারণে হতে পারে। হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালির রোগ, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস, সাইনাসের সমস্যা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স কিংবা ফুসফুসের ক্যানসারেও দীর্ঘদিন কাশি থাকতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে কাশি থাকার পাশাপাশি ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ক্ষুধামন্দা বা কফের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যক্ষ্মা আক্রান্ত কারও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করলে এসব উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যক্ষ্মা সন্দেহ হলে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন।
এর মধ্যে কফের নমুনা পরীক্ষা, দ্রুত আণবিক রোগনির্ণয় পরীক্ষা, জিনএক্সপার্ট, এএফবি মাইক্রোস্কপি এবং কালচার পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষাও করা হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মার উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত আণবিক রোগনির্ণয় পরীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষার একটি হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশেও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
যক্ষ্মা শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত ওষুধের পূর্ণ কোর্স শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে রোগ ফিরে আসার পাশাপাশি ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে রোগীর সঙ্গে বসবাসকারী বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যক্ষ্মা নিয়ে সামাজিক লজ্জা বা ভয় রোগীকে চিকিৎসা থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই রোগীকে আড়াল না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনাই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি এমন দেশে ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, অপুষ্টি, ডায়াবেটিস এবং রোগ শনাক্ত করতে দেরি হওয়া—এসব কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ২০২৪ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২০১ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। বৈশ্বিক হার ছিল প্রায় ১৩১ জন।
তাই দীর্ঘদিনের কাশিকে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। যক্ষ্মা শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূর্ণ চিকিৎসা নেওয়াই সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
যক্ষ্মা ছোঁয়াচে—কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য। সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার মাধ্যমে এর সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই কমানো সম্ভব।