
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় কঠোর নথিপত্রের শর্তের কারণে বিপাকে পড়ছেন দরিদ্র, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
গত বছরের জুনে শুরু হওয়া এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য জন্মসনদ, জমির দলিল ও শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো পুরোনো নথি চাওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন আগের নথিতে নামের বানান কিংবা অন্যান্য তথ্যের সামান্য অমিল থাকলেও অনেককে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রত্যেক নাগরিকের কাছে পুরোনো জন্মসনদ, জমির দলিল কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি থাকা নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষে এসব নথি সংগ্রহ করা কঠিন।
সমালোচকদের আশঙ্কা, নথিপত্রের জটিলতা ও তথ্যের অসংগতির কারণে প্রকৃত ভোটারদের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। এতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতে ভোটাধিকার শুধু নির্বাচনে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার মাধ্যম নয়; নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, স্বচ্ছতা এবং বাদ পড়া নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দল ও সমালোচকদের অন্যতম অভিযোগ, এতে মুসলিম ভোটারদের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব পড়ছে। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভোটারদের একটি অংশ এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
প্রতিবেদনটিতে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের প্রায় ৩৪ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের। বিহার, দিল্লি ও আসামের মতো রাজ্যেও একই ধরনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে শুধু কোনো জনগোষ্ঠীর কতজনের নাম বাদ পড়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মোট ভোটারসংখ্যা, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং আপিলের মাধ্যমে কতজনের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদত্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই সংখ্যা ও এর সময়সীমা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, কতজনের নাম স্থায়ীভাবে বাদ পড়েছে এবং কতজনের তথ্য যাচাই বা সংশোধনের অপেক্ষায় রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে তারা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখা যেকোনো নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ যাচাই, যুক্তিসংগত নথিপত্রের শর্ত এবং কার্যকর আপিলের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা এস ওয়াই কুরাইশি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করেছেন বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক এই নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কার্যকারিতা হারিয়েছে। তাঁর এই মন্তব্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা যেমন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন, তেমনি যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার সুরক্ষাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক শর্ত।
সূত্র: আল-জাজিরা।