
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-এর যুগে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—আমরা কি এমন কোনো শিল্পকর্মের কদর করব, যা মানুষের তৈরি নয়? বিবিসি-র রন অ্যাটকিন্স তাঁর ডিজে (DJ) করার অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রযুক্তির আশীর্বাদে এখন সহজেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে গান মিক্স করা যায়, কিন্তু মানুষ এখনো সেই 'হিউম্যান টাচ' বা মানুষের ছোঁয়াটাই বেশি পছন্দ করে। এআই-এর আগ্রাসনের কারণে বর্তমানে মানবসৃষ্ট শিল্পের কদর যেন আরও বেড়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন 'হিউম্যান প্রিমিয়াম' (Human Premium)। কিন্তু প্রযুক্তির এই দাপটে মানুষের এই কদর বা মূল্যায়ন কি দীর্ঘকাল টিকে থাকবে?
কিংস কলেজ লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল সাসকিন্ডের মতে, শিল্পের হিসাবনিকাশ প্রাত্যহিক কাজের মতো নয়। ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মানুষ শুধু মুগ্ধই হয় না, বরং এটি যে তারই মতো একজন রক্তমাংসের মানুষের মস্তিষ্ক ও হাতের তৈরি, তা ভেবে বিস্মিত হয়। ১৯৯৭ সালে দাবায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ যখন সুপারকম্পিউটার 'ডিপ ব্লু'-এর কাছে হেরে যান, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন দাবার জনপ্রিয়তা হয়তো কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, কারণ মানুষ শুধু বোর্ডের যান্ত্রিক চাল নয়, বরং পেছনের মানুষের মস্তিষ্কের লড়াই দেখতেই বেশি পছন্দ করে।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিক কাইল চাইকা মনে করেন, এআই-এর তৈরি লেখা ও শিল্পকর্মগুলো অনেকটাই সাধারণ, অনুগত ও একঘেয়ে হয়ে উঠছে। এর ফলে মানুষ এখন নিখুঁত এআই শিল্পের চেয়ে বরং একটু অগোছালো কিন্তু একান্তই ব্যক্তিগত ও মানবসৃষ্ট শিল্পের বেশি মূল্যায়ন করছে। মানবসৃষ্ট কাজের এই বাড়তি কদরকেই বলা হচ্ছে 'হিউম্যান প্রিমিয়াম'। এমনকি ভোক্তাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন বই, চলচ্চিত্র বা অ্যালবামের প্রচ্ছদে 'এআই-ফ্রি' বা 'হিউম্যান-মেড' লেবেল যুক্ত করার কাজ শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। লেখক জন ল্যানচেস্টারের মতে, কোনো জিনিস যখন যান্ত্রিক ও সহজলভ্য হয়ে যায়, তখন মানুষ এমন কিছুর কদর করতে শুরু করে যা যন্ত্র তৈরি করতে পারে না।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সংস্কৃতি সৃষ্টিতে মানুষই সর্বদা প্রধান ভূমিকা পালন করবে। তবে এআই-এর প্রসারের ফলে ভবিষ্যতে আসল আর নকলের পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর 'টিলি নরউড' নামের একটি এআই 'অভিনেত্রী' তৈরি করা হয়েছে। এখন এটিকে মানুষের আবেগহীন মনে হলেও ভবিষ্যতে হয়তো এই পার্থক্য ঘুচে যাবে। এছাড়া, এআই জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই প্রযুক্তি আমাদের সাংস্কৃতিক রুচি নির্ধারণ করতে শুরু করেছে। এখন আমরা কী গান শুনব বা কী মুভি দেখব, তা মূলত নির্ধারণ করে দেয় অ্যালগরিদম। ফলে মানুষের নিজস্ব রুচির জায়গায় প্রযুক্তির আধিপত্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| মূল প্রবন্ধকার | রন অ্যাটকিন্স (বিবিসি) |
| হিউম্যান প্রিমিয়াম কী? | এআই-এর যুগে মানবসৃষ্ট শিল্পের বাড়তি মূল্যায়ন বা কদর |
| ডিজার (Deezer) পরিসংখ্যান | প্ল্যাটফর্মটির ৪৪% ট্র্যাক এআই-জেনারেটেড; অর্ধেকেরও বেশি শ্রোতা মানবসৃষ্ট গান পছন্দ করেন |
| ইতিহাসের উদাহরণ | ১৯৯৭ সালে গ্যারি কাসপারভ বনাম আইবিএম ডিপ ব্লু (দাবা) |
| অ্যালগরিদমের প্রভাব | মানুষের ব্যক্তিগত রুচির বদলে প্রযুক্তির প্রিডিকশন বা ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে |