
বিয়ের পর অনেক নারীর শরীরে থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত হয়। এ নিয়ে কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগে, বিয়ে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া কিংবা সংসারের মানসিক চাপের সঙ্গে থাইরয়েডের সমস্যার কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রজননক্ষম বয়সে এ ধরনের সমস্যা শনাক্ত হওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে বিয়ের পর থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়লেই বিয়ে বা মানসিক চাপকে এর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
অনেক ক্ষেত্রে শরীরে আগে থেকেই থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেও তা বোঝার মতো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা গর্ভধারণের প্রস্তুতির সময় বিষয়টি সামনে আসে।
থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি। এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন শারীরিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গ্রন্থি থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি হরমোন নিঃসৃত হলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিয়ের পর অনেক নারী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করেন। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হতে পারে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আগে থেকে থাকা থাইরয়েডের সমস্যাও শনাক্ত হয়।
আবার গর্ভধারণের পর মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করাতে পারেন। গর্ভধারণে জটিলতা দেখা দিলে বা নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ থাকলে এ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে বিয়ের পর থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়লেও সেটি যে ওই সময়েই শুরু হয়েছে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু পরীক্ষা না করানোর কারণে তা শনাক্ত হয়নি।
বিয়ের পর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, সংসারের দায়িত্ব পালন এবং পারিবারিক নানা পরিস্থিতির কারণে অনেক নারীর মানসিক চাপ বাড়তে পারে। কারও ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে।
তবে বিয়ে বা শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের চাপ সরাসরি থাইরয়েডের রোগ সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অটোইমিউন রোগ, বংশগত প্রবণতা, কিছু ওষুধের প্রভাব এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থা উল্লেখযোগ্য। মানসিক চাপ শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা ও রোগের উপসর্গকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে একে থাইরয়েডের সমস্যার একমাত্র কারণ বলা যায় না।
তাই বিয়ের পর থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে এর প্রকৃত কারণ ও ধরন বুঝতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ধরন অনুযায়ী উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় এসব লক্ষণ অন্য শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও মিলে যায়।
থাইরয়েডের হরমোন কম নিঃসৃত হলে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া, ঠান্ডা বেশি লাগা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বক শুষ্ক হওয়া কিংবা মাসিক অনিয়মিত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, হরমোন বেশি নিঃসৃত হলে ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, হাত কাঁপা, অস্থিরতা এবং গরম সহ্য করতে অসুবিধা হতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই থাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভধারণের আগে থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। আগে থেকে থাইরয়েডের রোগ থাকলে গর্ভধারণের পরিকল্পনা এবং গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন হতে পারে।
থাইরয়েডের হরমোনের ভারসাম্যহীনতা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে গর্ভধারণ ও গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক নারীই সুস্থভাবে গর্ভধারণ করতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া থাইরয়েডের ওষুধ শুরু করা, বন্ধ করা কিংবা এর মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
বিয়ের পর থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে বিয়ে বা মানসিক চাপের কারণে রোগটি হয়েছে। অনেক সময় আগে থেকে থাকা উপসর্গহীন সমস্যা স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে।
ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন কিংবা মাসিকের অনিয়মের মতো লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
অনুমান বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণই থাইরয়েডের সমস্যা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।