নিজস্ব প্রতিবেদক:
আধুনিক জীবনযাত্রায় সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের চোখ প্রায় অবিরাম কোনো না কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অফিসের দাপ্তরিক কাজ, পড়াশোনা কিংবা বিনোদন—সব মাধ্যমেই এখন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর কম্পিউটারের জয়জয়কার। প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহারের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাবটি পড়ছে আমাদের অমূল্য সম্পদ ‘চোখ’-এর ওপর। ফলে অল্প বয়সেই দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া, চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া (ড্রাই আই), নিয়মিত মাথা ব্যথা এবং চোখের নানা জটিলতা এখন ঘরে ঘরে দেখা দিচ্ছে। তবে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই এই মহামূল্যবান অঙ্গটিকে সুস্থ ও সতেজ রাখা সম্ভব।
### চোখের ক্লান্তি দূর করতে ‘২০-২০-২০’ সূত্র
কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনে একটানা তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক পড়ার স্বাভাবিক হার অনেকটাই কমে যায়, যা চোখকে শুষ্ক করে তোলে। স্ক্রিনের এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে চিকিৎসকেরা ‘২০-২০-২০’ (20-20-20 rule) নিয়মটি অনুসরণের পরামর্শ দেন:
প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনে কাজ করার পর,
অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য একটি বিরতি নিন,
এবং ২০ ফুট দূরত্বের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকুন।
এই সহজ অভ্যাসটি চোখের পেশির ওপর তৈরি হওয়া চাপ ও ক্লান্তি নিমেষেই দূর করতে দারুণ কার্যকর।
খাদ্যতালিকায় থাকুক পুষ্টিকর খাবার
দৃষ্টিশক্তি উন্নত রাখতে এবং চোখের সুরক্ষায় প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ উপাদান রাখা জরুরি।
সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, ব্রোকলি এবং অন্যান্য সবুজ শাকে থাকা লুটেইন ও জিক্সাথিন চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার: গাজর, মিষ্টি আলু, পাকা পেঁপে ও আম নিয়মিত খাওয়া উচিত।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: ছোট মলা-ঢেলা মাছ এবং সামুদ্রিক মাছ চোখের অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘরের সঠিক আলো
চোখকে সুস্থ রাখতে দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে চোখের চারপাশের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া কম আলোতে কাজ করা বা পড়াশোনা করা চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। বিশেষ করে অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো চোখের রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তাই কাজ করার সময় ঘরের আলোর সামঞ্জস্য বজায় রাখা আবশ্যক।
রোদে সানগ্লাস ও ধূমপান বর্জন
বাইরে বের হওয়ার সময় সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে ভালো মানের ইউভি-প্রটেক্টেড সানগ্লাস পরা উচিত। পাশাপাশি, চিকিৎসকদের মতে অতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস চোখের ছানি পড়া এবং রেটিনার ক্ষয়জনিত (Macular Degeneration) রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই এই অভ্যাস পরিহার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞের জরুরি পরামর্শ
যেকোনো জটিলতা এড়াতে বছরে অন্তত একবার অভিজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকের মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে যাদের পরিবারে গ্লুকোমা বা ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের চোখের ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছামতো আই-ড্রপ কিনে ব্যবহার করা চোখের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শেষ কথা: চোখ শুধু আমাদের চারপাশের সুন্দর পৃথিবীকে দেখতেই সাহায্য করে না, এটি আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই চোখের সামান্যতম সমস্যাকেও খাটো করে না দেখে, আজই সচেতন হওয়া এবং সঠিক যত্ন নেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।