
সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পরই যদি পিঠের নিচের অংশে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভূত হয়, তাহলে দিনের শুরুতেই অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। অনেকেই এ সমস্যাকে ঘুমানোর ভুল ভঙ্গির ফল বলে মনে করেন। তবে নিয়মিত এমন ব্যথা হলে এর পেছনে অন্য কোনো শারীরিক কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সকালে পিঠে ব্যথা হওয়ার পেছনে মেরুদণ্ডের পরিবর্তন, পেশিতে অতিরিক্ত চাপ, ঘুমানোর ভঙ্গি কিংবা ব্যবহৃত তোশকের মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া ফাইব্রোমায়ালজিয়া ও গর্ভাবস্থার কারণেও পিঠে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট মেডিকেল নিউজ টুডের এক প্রতিবেদনে সকালে পিঠে ব্যথা হওয়ার সাতটি সম্ভাব্য কারণ, ব্যথা কমানোর উপায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের কশেরুকার মাঝখানে থাকা ডিস্কে ক্ষয় বা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ফলে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এতে পিঠ বা কোমরে ব্যথা, শক্তভাব এবং স্বাভাবিক চলাফেরায় অসুবিধা হতে পারে।
সকালে ব্যথা বেশি অনুভূত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, সামনের দিকে ঝুঁকে কাজ করা কিংবা ভারী জিনিস তোলার সময়ও ব্যথা বাড়তে পারে।
ফাইব্রোমায়ালজিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, যার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা ও স্পর্শকাতরতা দেখা দেয়। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পিঠে ব্যথা ও শরীর শক্ত হয়ে থাকার অভিযোগ করতে পারেন।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধাও দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা খেলাধুলার সময় পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়লে পরদিন সকালে পিঠে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে শরীরের সামর্থ্যের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ঝুঁকি কমাতে ব্যায়ামের আগে ওয়ার্মআপ করা, শেষে হালকা কুলডাউন করা এবং ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুম থেকে উঠেই দ্রুত উঠে বসা বা কোমর অতিরিক্ত বাঁকিয়ে বিছানা ছাড়ার কারণে পিঠের পেশিতে চাপ পড়তে পারে। আগে থেকেই ব্যথা থাকলে এভাবে ওঠানামায় অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
তাই ঘুম ভাঙার পর ধীরে পাশ ফিরে বসুন। এরপর পা মেঝেতে রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। এতে হঠাৎ শরীরে চাপ পড়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
রাতে ঘুমানোর সময় শরীরের অবস্থান ঠিক না থাকলে মেরুদণ্ড ও আশপাশের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এর ফলে সকালে পিঠে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভূত হতে পারে।
চিত হয়ে ঘুমানোর সময় হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখা যেতে পারে। আবার কাত হয়ে ঘুমালে দুই হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে সহায়তা হতে পারে। তবে কোন ভঙ্গিতে আরাম পাওয়া যাবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
অতিরিক্ত নরম, দেবে যাওয়া কিংবা শরীরকে যথেষ্ট সমর্থন দিতে পারে না—এমন তোশকে ঘুমালে কারও কারও পিঠে ব্যথা বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় একই তোশকে ঘুমানোর পর সকালে নিয়মিত অস্বস্তি হলে সেটির অবস্থা ও উপযোগিতা যাচাই করা যেতে পারে।
তোশক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নরম বা শক্ত হওয়ার বিষয়টি নয়, বরং ঘুমের সময় শরীর ও মেরুদণ্ড যথাযথ সমর্থন পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরে ব্যথা হওয়া বেশ সাধারণ। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পেলভিসের কিছু লিগামেন্ট ও জয়েন্ট শিথিল হতে পারে। একই সঙ্গে গর্ভের শিশুর ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে।
এসব কারণে পিঠের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং ব্যথা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় ব্যথা বেশি হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সকালে পিঠে হালকা ব্যথা অনুভূত হলে কিছু অভ্যাস উপকার দিতে পারে। যেমন—
তবে ব্যথার কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তাই দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পিঠে ব্যথা কয়েক দিনেও না কমলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথার সঙ্গে জ্বর, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলেও বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে পিঠে ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা, দুই পায়ের মাঝের অংশে অসাড়তা কিংবা পায়ে বাড়তে থাকা দুর্বলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট বা বুকব্যথার সঙ্গে পিঠে ব্যথা হলেও দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
সকালে পিঠে ব্যথা হলেই তা গুরুতর রোগের লক্ষণ—এমন নয়। তবে নিয়মিত ব্যথা হলে শুধু ঘুমানোর ভঙ্গিকে দায়ী না করে সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদন: Touch Bangla News