
চাঁদের দুই পিঠ দেখতে কেন সম্পূর্ণ আলাদা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের এক রহস্যের সম্ভবত অবসান হতে চলেছে। চীনের মহাকাশযান 'চ্যাং'ই-৬' (Chang'e-6) প্রথমবারের মতো চাঁদের দূরবর্তী অংশ (ফার সাইড) থেকে যে নমুনা পৃথিবীতে এনেছিল, তা বিশ্লেষণ করেই এই নতুন সূত্র পেয়েছেন গবেষকরা। নানজিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হেজিউ হুইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল জানিয়েছে, কোটি কোটি বছর আগে চাঁদের অভ্যন্তরে গলিত পাথরের (ম্যাগমা) বিশাল প্রবাহই চাঁদের দুই পিঠের এই নাটকীয় পার্থক্যের জন্ম দিয়েছিল।
পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের যে পিঠটি সবসময় দেখি (নিয়ার সাইড), তা মূলত অন্ধকার আগ্নেয়গিরির ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত বিশাল সমতল প্রান্তর। এখানে পটাশিয়াম, বিরল মৃত্তিকা উপাদান এবং ফসফরাস (KREEP) তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, চাঁদের যে দিকটি কখনোই পৃথিবীর দিকে ঘোরে না (ফার সাইড), সেটি অসংখ্য গর্তে (Crater) ভরা প্রাচীন উচ্চভূমি। পেছনের এই অংশের ভূত্বক বা ক্রাস্ট অনেক বেশি পুরু এবং সেখানে আগ্নেয়গিরির সমতল প্রায় নেই বললেই চলে। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এই অসম ভৌগোলিক গঠনের কারণ ছিল একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন।
২০২৪ সালে চ্যাং'ই-৬ মিশন প্রথমবারের মতো চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আনে। নানজিং ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই নমুনা বিশ্লেষণ করে নাসার অ্যাপোলো ও চীনের চ্যাং'ই-৫ মিশনের আনা 'নিয়ার সাইড'-এর নমুনার সাথে তুলনা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায়, চাঁদের পৃষ্ঠের দুই পিঠে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও এর ভেতরের স্তরের (Mantle) রাসায়নিক গঠনে খুব একটা পার্থক্য নেই। দুই পিঠের গভীরের ম্যান্টল শিলাগুলো একই রকম রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। পার্থক্যটি মূলত তৈরি হয়েছে ভূত্বক বা ক্রাস্টের স্তরে। চ্যাং'ই-৬ এর নমুনায় ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে, যা দূরবর্তী অংশের পুরু ভূত্বকের প্রমাণ দেয়।
সব তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা একটি মডেল তৈরি করেছেন। তাদের মতে, যখন চাঁদ পৃথিবীর সাথে টাইডালি লকড (Tidally locked) হয়ে যায়, তখন চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব বর্তমানের চেয়ে অনেক কম ছিল। পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে চাঁদের পৃথিবীর দিকের অংশে বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। এই অসম তাপমাত্রার কারণে চাঁদের গলিত অভ্যন্তরে (ম্যাগমা মহাসাগর) এক বিশাল প্রবাহ তৈরি হয়। উত্তপ্ত ম্যাগমা পৃথিবীর দিক থেকে পেছনের দিকের অংশে প্রবাহিত হতে থাকে এবং সাথে করে ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ অ্যানরথোসাইট উপাদান বয়ে নিয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে চাঁদের পেছনের অংশে এসব উপাদান জমা হয়ে পুরু ভূত্বক তৈরি করে এবং বাকি তরল উপাদানগুলো পৃথিবীর দিকে জমা হয়ে বর্তমানের সমতল ব্যাসল্ট পৃষ্ঠ তৈরি করেছে।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| গবেষণার বিষয় | চাঁদের দুই পিঠের ভৌগোলিক ও রাসায়নিক ভিন্নতার কারণ |
| গবেষণাকারী দল | নানজিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হেজিউ হুইয়ের নেতৃত্বাধীন দল |
| ব্যবহৃত নমুনা | চ্যাং'ই-৬ (দূরবর্তী অংশ) এবং অ্যাপোলো ও চ্যাং'ই-৫ মিশন (নিকটবর্তী অংশ) |
| পার্থক্যের মূল কারণ | পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব ও চাঁদের অভ্যন্তরীণ ম্যাগমা প্রবাহ |
| উল্লেখযোগ্য উপাদান | অ্যানরথোসাইট, এমজি-সুইট (Mg-suite) শিলা এবং মেয়ার ব্যাসল্ট |
| তথ্যসূত্র | সায়েন্স চায়না প্রেস |