অর্থনৈতিক সংকট আর নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থেমে নেই দুর্গাপূজার আয়োজন। নিজেদের জমানো মুষ্টির চাল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় শেরপুরে দুর্গাপূজার আয়োজন করছেন আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের একদল নারী। নারীশক্তির জাগরণ এবং নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে তাঁদের এই উদ্যোগ।
শেরপুর জেলা শহরের পৌর এলাকার সাতানীপাড়া মহল্লায় বসবাস করেন আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষেরা। তাঁদের অনেকেই দিন এনে দিন খান। এমন আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেই মহল্লার নারীরা নিজেদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।
এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালে গড়ে তোলা হয় ‘উমা সংঘ’। সংগঠনটির ২৩ সদস্যের সবাই নারী। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া তাঁদের এই আয়োজন এবার তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পূজার খরচ জোগাতে মহল্লার ৪২টি পরিবার থেকে প্রতিদিন এক মুষ্টি করে চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন সংগঠনের সদস্যরা। পরে সেই চাল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সঞ্চয় করা হয়। এভাবে বছরজুড়ে তাঁদের তহবিলে জমেছে ৬০ হাজার টাকা।
তবে দুর্গাপূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে কয়েক লাখ টাকা প্রয়োজন হওয়ায় শুধু নিজেদের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে পারছেন না তাঁরা। তাই পূজার বাকি খরচ মেটাতে স্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করছেন সংগঠনের সদস্যরা।
ইতোমধ্যে শেরপুর শহরের পালপাড়া থেকে ৬০ হাজার টাকায় প্রতিমা তৈরি করে অস্থায়ী মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। পূজাকে সামনে রেখে চলছে মণ্ডপের সাজসজ্জা, তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের কাজ।
১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে শেষ হওয়ার কথা এবারের দুর্গোৎসব। নারীদের এই উদ্যোগে স্থানীয় পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরাও সহযোগিতা করছেন।
উমা সংঘের সভাপতি মুক্তি বিশ্বাস বলেন, নারীরা শক্তির প্রতীক। নারীশক্তির জাগরণ এবং পুরুষদের পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের সক্ষমতা তুলে ধরতেই তাঁদের এই আয়োজন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে প্রথমবার পূজার আয়োজন করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারও তাঁরা উদ্যোগ নিয়েছেন। পরিবারগুলো থেকে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে বিক্রি করা অর্থ দিয়েই কাজ শুরু হয়েছিল। সবার পরিশ্রম ও সহযোগিতায় এবারও পূজার আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সুমিতা বিশ্বাস বলেন, সাতানীপাড়া মহল্লায় আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ ও সাহা পরিবারের সদস্যরাও বসবাস করেন। তাঁরাও পূজার আয়োজনে সহযোগিতা করছেন।
সুমিতা বিশ্বাসের ভাষ্য, সবার সহযোগিতা তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এবার সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
স্থানীয় আদিবাসী নেতা বিদ্বান বিশ্বাস নারীদের এই উদ্যোগকে সাহসিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর নারীরা নিজেদের উদ্যোগে যে আয়োজন করেছেন, তা প্রশংসার যোগ্য।
এই নারীদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দিতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শেরপুর জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি জিতেন্দ্র মজুমদার বলেন, উমা সংঘের জন্য অন্য মণ্ডপের তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কিছুটা বেশি রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, এই নারীরা শুধু দুর্গাপূজার আয়োজন করছেন না, বরং নারীশক্তিরও আরাধনা করছেন।
সীমিত সামর্থ্য, প্রতিদিনের জীবিকার সংগ্রাম আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও উমা সংঘের নারীদের এই উদ্যোগ তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। নিজেদের সঞ্চয় ও মানুষের সহযোগিতায় তাঁরা যে আয়োজন এগিয়ে নিচ্ছেন, তার মধ্য দিয়ে উঠে আসছে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও।