
টেস্ট ক্রিকেটে স্পিন বরাবরই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্পিনারদের দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় সব জয় পেয়েছিল টাইগাররা। আব্দুর রাজ্জাক, নাঈম হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামদের মতো বোলাররা স্পিন-বান্ধব উইকেটে রাজত্ব করেছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ দল দেশে-বিদেশে পেসারদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হচ্ছে। স্পিন এখনো উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলেও, ফ্ল্যাট বা পাটা উইকেটে এসে বাংলাদেশের স্পিনারদের বারবার খেই হারিয়ে ফেলার দৃশ্য বেশ হতাশাজনক। স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে কিংবদন্তি মুশতাক আহমেদের লিগ্যাসি তাই অনেকটাই নির্ভর করছে ফ্ল্যাট উইকেটে স্পিনারদের এই ব্যর্থতার ধাঁধা সমাধানের ওপর।
পরিসংখ্যান বলছে, মুশতাক আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত আড়াই বছরে ২০টি টেস্ট খেলে বাংলাদেশের স্পিনাররা ১৭৭টি উইকেট শিকার করেছেন। এর আগের সময়কালে এই সংখ্যা ছিল ১৫১। দলের সেরা স্পিনার সাকিব আল হাসান ২০২৪ সালের কানপুর টেস্টের পর থেকে দলে না থাকলেও স্পিনারদের গড় ৩২.৪১ থেকে ২৮.৭৭-এ নেমে এসেছে, আর স্ট্রাইক রেট ৬৮ থেকে কমে ৫৫.৮ হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রে। মুশতাকের অধীনে ১৪ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন স্পিনাররা, যা আগের সময়কালের (৭ বার) চেয়ে দ্বিগুণ।
স্পিনাররা পেসারদের ভালো সাপোর্ট দিলেও, ফ্ল্যাট উইকেটে যখন স্পিনারদেরই মূল দায়িত্ব নিতে হয়, তখন তারা হতাশ করছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চেন্নাই টেস্টে পেসার হাসান মাহমুদরা ভারতকে ১৪৪/৫-এ আটকে দেওয়ার পর পিচ থেকে পেসারদের সুবিধা কমে যায়। তখন স্পিনাররা সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হন; মিরাজ ৭৭ রানে ১ উইকেট এবং সাকিব উইকেটশূন্য থেকে ৫০ রান দেন। অন্যদিকে ভারতের অশ্বিন ও জাদেজা মিলে ১৯৯ রানের জুটি গড়েন। অক্টোবরে মিরপুর ও চট্টগ্রাম টেস্টেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একই চিত্র দেখা যায়। স্পিন-বান্ধব মিরপুরে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে একাদশে মাত্র একজন পেসার নিয়েও স্পিনাররা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেননি। প্রথম ইনিংসে তাইজুল ৫ উইকেট (৫/১২২) পেলেও, ৩ স্পিনার মিলে পুরো ম্যাচে মাত্র ১০টি উইকেট পান। চট্টগ্রামে প্রোটিয়ারা ৫৭৫/৬ রান করে ইনিংস ঘোষণা করার সময় মিরাজ ও তাইজুলের গড় ছিল ৭৩.৮! সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুনে কলম্বো টেস্টেও লঙ্কান স্পিনারদের (গড় ১৭.১৪) তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন বাংলাদেশের স্পিনাররা (গড় ৩৬.৬)।
মুশতাক আহমেদ মনে করেন, পাটা বা ফ্ল্যাট উইকেটই একজন স্পিনারের আসল টেকনিকের পরীক্ষা নেয়। হাই পারফরম্যান্স (HP) ও গেম ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের বোলারদের নিয়ে আয়োজিত ক্যাম্পগুলোতে তিনি এই বার্তাটিই দিয়ে আসছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মুশতাকের অবদান শুধু স্পিন বোলিংয়েই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি দলের পরিবেশ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা বাড়াতেও কাজ করছেন। তাইজুল ও মিরাজ উভয়েই টেস্টে ২০০টির বেশি উইকেট পেয়েছেন, কিন্তু ফ্ল্যাট উইকেটে তাদের কার্যকর করে তোলাই এখন মুশতাকের মূল চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ড্র হওয়া টেস্টে স্পিনাররা জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ হয়তো জিততেও পারত। ফ্ল্যাট উইকেটে স্পিনারদের পারফর্ম করানোই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে মুশতাক আহমেদের সাফল্যের সত্যিকারের লিগ্যাসি।
| পরিসংখ্যানের মাপকাঠি | আগের সময়কাল | মুশতাক আহমেদের সময়কাল |
|---|---|---|
| টেস্ট ম্যাচে স্পিনারদের মোট উইকেট | ১৫১টি | ১৭৭টি (২০ ম্যাচে) |
| স্পিনারদের বোলিং গড় | ৩২.৪১ | ২৮.৭৭ |
| বোলিং স্ট্রাইক রেট | ৬৮.০ | ৫৫.৮ |
| ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার | ৭ বার | ১৪ বার |