![]()
ফিচার ডেস্ক | টাচবাংলাদেশ
তারিখ: ২২ জুন, ২০২৬
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাটির নিচে মিশে আছে হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এ দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন রাজবংশ, বৌদ্ধ শাসনকাল এবং সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যের অনন্য সব কীর্তি। ইট-পাথরের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে যারা ইতিহাসের পাতায় ডুব দিতে চান, তাদের জন্য দেশের শীর্ষ পাঁচটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. পাল সাম্রাজ্যের অনন্য কীর্তি: পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
প্রাচীন স্থাপত্যের এক জীবন্ত বিস্ময় নওগাঁ জেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যা ‘সোমপুর মহাবিহার’ নামেও পরিচিত। অষ্টম শতকে পাল বংশের দ্বিতীয় প্রভাবশালী রাজা শ্রী ধর্মপাল দেব এই বিশাল স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এই বৌদ্ধ বিহারটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর চারপাশের সারি সারি সন্ন্যাসী কক্ষ এবং মাঝখানের বিশালাকার কেন্দ্রীয় ঢিবি প্রাচীনকালের উন্নত শিক্ষা, দীক্ষা ও সংস্কৃতির অকাট্য সাক্ষ্য বহন করে।
২. প্রাচীন সভ্যতার প্রবেশদ্বার: মহাস্থানগড়
বগুড়া শহর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগরী মহাস্থানগড়। ঐতিহাসিক এই স্থানটি একসময় ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ বা ‘পুণ্ড্রনগর’ নামে প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ রাজধানী ছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শক্তিশালী রাজবংশের শাসনকাল এই নগরীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এখানকার বৈরাগীর ভিটা, পরশুরামের প্রাসাদ, গোবিন্দ ভিটা এবং শিলাদেবীর ঘাট পর্যটকদের নিমেষেই সুদূর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
৩. মুঘল স্থাপত্যের রাজকীয় নিদর্শন: লালবাগ কেল্লা
রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুঘল আমলের অপূর্ণাঙ্গ অথচ চোখধাঁধানো দুর্গ লালবাগ কেল্লা। ১৬৭৮ সালে মুঘল যুবরাজ মুহাম্মদ আজম শাহ এর নির্মাণকাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে তা আর শেষ করা সম্ভব হয়নি। লাল ইটের তৈরি এই দুর্গের ভেতরে রয়েছে সুদৃশ্য পরি বিবির মাজার, দরবার হল, তিন গম্বুজবিশিষ্ট শাহী মসজিদ এবং একটি চমৎকার জাদুঘর, যা মুঘলদের আভিজাত্য ও নির্মাণশৈলীর অনন্য উদাহরণ।
৪. প্রাচীন সমতটের গৌরব: ময়নামতি ও শালবন বিহার
কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার লালমাই পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ হলো ঐতিহাসিক শালবন বিহার। ধারণা করা হয়, সপ্তম শতকের শেষ ভাগে দেব বংশের চতুর্থ রাজা শ্রী ভবদেব এটি নির্মাণ করেছিলেন। বিহারের পাশাপাশি এখানকার রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন মুদ্রা ও পোড়ামাটির ফলক ইতিহাসপ্রেমী দর্শনার্থীদের ভীষণভাবে মুগ্ধ করে।
৫. সুলতানি আমলের স্থাপত্য বিস্ময়: ষাট গম্বুজ মসজিদ
বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি পঞ্চদশ শতকে বিখ্যাত সুফি সাধক পীর খান জাহান আলী নির্মাণ করেন। এটিও ইউনেস্কো (UNESCO) ঘোষিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এই প্রাচীন স্থাপত্যের নামকরণে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত কারিগরি রহস্য। মসজিদটির নাম ‘ষাট গম্বুজ’ হলেও প্রকৃতপক্ষে এতে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে (যার মধ্যে ৭৭টি ছাদের ওপর এবং ৪টি কর্নার টাওয়ারের ওপর নির্মিত)। সুলতানি আমলের পোড়ামাটির সূক্ষ্ম অলংকরণ ও এর বিশালতা আজও পর্যটকদের বিস্মিত করে।
ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ: এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর প্রায় প্রতিটির সাথেই একটি করে সরকারি জাদুঘর রয়েছে। খননকাজের সময় উদ্ধার হওয়া প্রাচীন মুদ্রা, অলংকার, টেরাকোটা ও মূর্তিগুলো এসব জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তাই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের স্বাদ পেতে স্থানগুলো ঘুরে দেখার পাশাপাশি জাদুঘরগুলো দেখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।
