![]()
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা সামান্তা শারমিন। কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের পর পদাবনতির ১৩ দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দেন।
বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে পদত্যাগের বিষয়টি জানান সামান্তা শারমিন। সেখানে তিনি এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্ভাব্য জোট নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের আপত্তির কথা তুলে ধরেন।
সামান্তা জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত—কোনো বিবেচনাতেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এর জন্য কঠিন রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
দলের নীতিগত অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন বলেন, গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। আলোচনা, বিতর্ক এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে মতপার্থক্য ও নানা ধরনের সংকট থাকতে পারে। দল ভুল পথে এগোলে তা থেকে দলকে ফেরানোর চেষ্টা করা রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ। সেই বিবেচনায় তিনি এনসিপির ভেতরে থেকেই মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে গেছেন।
তবে প্রায় এক বছরের সেই প্রচেষ্টার অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সামান্তার মতে, এনসিপির পক্ষে এখন আর দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আন্তরিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
পদত্যাগের সময় নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। সামান্তা বলেন, কোনো একটি সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁর পদত্যাগকে দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন সময়ের জন্য তিনি অপেক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর কাছে সেই অপেক্ষার আর কোনো অর্থ নেই।
তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট থেকে সরে এলেও পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারবে না।
২৩ অক্টোবর কমিটি পুনর্গঠন, পদাবনতি সামান্তার
গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। ২১৭ সদস্যের আগের কমিটি কমিয়ে ১৯৬ সদস্যে আনা হয়। নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেন বহাল থাকেন।
তবে পুনর্গঠনের সময় মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো কয়েকটি পদ বিলুপ্ত করা হয়। এর পরিবর্তে সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদ তৈরি করা হয়।
নতুন কমিটিতে কয়েকজন নেতার পদোন্নতি হলেও কয়েকজনের পদাবনতি ঘটে। এর মধ্যে সামান্তা শারমিনকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। একই সঙ্গে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদ থেকেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া আরিফুল ইসলাম আদীবকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হলেও রাজনৈতিক পর্ষদে তাঁর অবস্থান বহাল রাখা হয়। আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভাকে নতুন কমিটিতে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়।
এসব পদ পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে দলীয় একটি সূত্রের দাবি, নেতাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ বিলুপ্ত হওয়ায় নেতৃত্বে সমন্বয় আনতে এসব পরিবর্তন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি পারিবারিক সংকট
সাম্প্রতিক সময়ে সামান্তা শারমিনের দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা তুলনামূলক কম ছিল। জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে মতপার্থক্যের পাশাপাশি পারিবারিক কারণেও তিনি সংগঠনকে আগের মতো সময় দিতে পারছিলেন না বলে জানা গেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক পোস্টে স্বামীর অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলেন সামান্তা। তখন তিনি বলেছিলেন, তাঁর স্বামীর চিকিৎসা চলছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাখতেই এতদিন বিষয়টি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেননি।
এনসিপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ১৬ সদস্যের রাজনৈতিক পর্ষদের তালিকাও গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়। ওই পর্ষদে রয়েছেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দলের অন্য নেতারা।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এনসিপির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও জোটের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
