Touch Bangladesh
ঢাকাশুক্রবার , ৬ নভেম্বর ২০২৬
  1. অর্থ-বাণিজ্যের সমাধানের খোঁজে
  2. উন্নয়নের ছোঁয়ায় বিজ্ঞান তথ্য ও প্রযুক্তি
  3. খেলাধুলার আনন্দ
  4. ছবি কথা বলে
  5. টাচ বাংলা মুহুর্ত
  6. টাচ বাংলাদেশ সংবাদ
  7. ধর্মের স্বাধীনতার আওয়াজ
  8. নতুন কর্মের খোঁজে
  9. নিত্যদিনের জীবন
  10. বিশেষ সংবাদ সমূহ
  11. রাষ্ট্রের কল্যাণে সম্পাদকীয়
  12. রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন
  13. রেমিট্যান্সযোদ্ধার চেতনা
  14. শিক্ষার আলোর প্রস্তাব
  15. শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বিনোদনের ঠিকানা
আলোচিত সপ্তাহের খবর

”আমরা আমাদের ভাগ্য নিজেরাই পরিবর্তন করব”

প্রতিবেদক
Touch Bangladesh News
নভেম্বর ৬, ২০২৬ ১২:৩৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

Loading

মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান

একটি আত্মমর্যাদাশীল, স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম এবং স্বনির্ভরতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু ঐতিহাসিক মোড় রয়েছে যা আমাদের জাতীয় চেতনাকে বারবার শাণিত করেছে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংগঠিত ‘ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ অন্যতম। এই দিনটি কেবল ক্ষমতার রদবদল বা সামরিক-জনতার একটি তাৎক্ষণিক অভ্যুত্থান ছিল না, বরং এটি ছিল আধিপত্যবাদ ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ। বর্তমান সময়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে প্রত্যয় আমাদের মধ্যে রয়েছে, তা বাস্তবায়নে ৭ নভেম্বরের চেতনা ও আদর্শ অন্যতম প্রধান এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
১৯৭৫ সালের আগস্ট ও নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ এক চরম রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ এবং অস্থিতিশীলতা জনমনে গভীর হতাশা ও সংশয় সৃষ্টি করেছিল। ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়, যা দেশকে এক চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সিপাহি ও জনতা রাজপথে নেমে আসে। তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন দেশপ্রেমিক সেনাপতি জিয়াউর রহমানকে। সেদিন ঢাকা তথা পুরো দেশের রাজপথ মুখরিত হয়েছিল “সিপাহি-জনতা ভাই ভাই” স্লোগানে। এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের পথ সুগম হয় এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয়।
৭ নভেম্বরের মূল বাণী হলো জাতীয় সংহতি ও অখণ্ডতা। দল, মত, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে সেদিন একাত্ম হয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। এই সংহতির মূল চালিকাশক্তি ছিল নিখাদ দেশপ্রেম এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাড়না। সেদিন বাঙালি জাতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি শক্তির আধিপত্য বা হস্তক্ষেপ তারা বরদাশত করবে না। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্তই হলো এই জাতীয় ঐক্য। একটি বিভক্ত জাতি কখনো অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের শেখায় যে, জাতীয় স্বার্থে সব ভেদাভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হওয়া কতটা জরুরি।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এক নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক যাত্রার সূচনা করে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে শুরু হয় স্বনির্ভরতার এক নতুন অধ্যায়। খাল খনন কর্মসূচি, গণশিক্ষা চালুকরণ, কৃষি বিপ্লব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে ও সম্পদে স্বাবলম্বী করার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের শ্রম, মেধা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি অনুন্নত দেশকে উন্নয়নের মূলধারায় আনা যায়, তার সফল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল এই চেতনার হাত ধরেই। স্বনির্ভরতার এই দর্শনের মূল কথাই ছিল—”আমরা আমাদের ভাগ্য নিজেরাই পরিবর্তন করব।”
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশ একটি উন্নত, আধুনিক ও সম্পূর্ণ স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে, তখন ৭ নভেম্বরের চেতনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বর্তমান সময়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের নিম্নলিখিত খাতগুলোতে এই চেতনাকে ধারণ করতে হবে:
বিদেশি ঋণের ফাঁদ ও পরনির্ভরশীলতা এড়াতে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষি, পোশাক শিল্প ও কুটির শিল্পের আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। ৭ নভেম্বরের আত্মনির্ভরশীলতার দর্শন আমাদের দেশীয় সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের তাগিদ দেয়।

৭ নভেম্বরের বিপ্লব ছিল তরুণ সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আজকের তরুণেরা যদি ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্ট-আপ এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে দেশের বেকারত্ব দূর হবে এবং অর্থনীতি দ্রুত স্বনির্ভর হবে।
৭ নভেম্বর দেশের বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়েছিল। একটি স্বনির্ভর দেশ গড়তে হলে দেশে আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং রাজনৈতিক মেলবন্ধন ও সহনশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য।

বিশ্ব রাজনীতির নানামুখী মেরুকরণে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের শেখায় ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—এই নীতিতে অটল থেকে দেশের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখা এবং কোনো শক্তির চাপের কাছে মাথা নত না করা।

৭ নভেম্বরের চেতনা কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি চলমান আদর্শ। যখনই জাতি কোনো সংকটে পড়বে, যখনই দেশের সার্বভৌমত্ব কিংবা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে, তখনই ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের পথ দেখাবে। এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার, অনৈক্যের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ার এবং পরনির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে স্বাবলম্বী হওয়ার এক অন্তহীন শক্তির উৎস। এই চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সম্পদ কম থাকলেও দেশপ্রেম ও সঠিক নেতৃত্ব থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা জয় করা সম্ভব।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে “সবার আগে বাংলাদেশ”—এই নীতিকে বুকে ধারণ করে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সেই সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনই এর মূল উদ্দেশ্য।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। যতক্ষণ না রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্যাসিবাদের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে, ততক্ষণ অভ্যুত্থানের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না।

একটি উন্নত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণ কেবল অর্থনৈতিক সূচকের উন্নয়ন নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের আত্মমর্যাদার সাথে জড়িত। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার সেই ঐতিহাসিক সংহতি আমাদের জাতীয় জীবনের এক আলোকবর্তিকা। আজকের তরুণ প্রজন্ম এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত সেই ঐতিহাসিক দিনটির মূল শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করা। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা যদি একটি বৈষম্যহীন, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, তবেই ৭ নভেম্বরের শহিদদের এবং মুক্তিকামী জনতার স্বপ্ন সফল হবে। ৭ নভেম্বরের চেতনা চিরকাল আমাদের অগ্রযাত্রার পথে অন্তহীন প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকুক।

লেখক- স্পীন স্পীকার, নজরুল গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক ও যুগ্ম-সম্পাদক, দৈনিক নিরপেক্ষ ।

error: লেখাগুলো টাচ বাংলাদেশ - স্পর্শে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।