![]()
ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী কর্তৃক লোহিত সাগর উপকূলের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলের মুখে দেশজুড়ে সাধারণ সামরিক সমাবেশ (General Mobilisation) এবং জনগণকে সশস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার। সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি লোহিত সাগর উপকূল থেকে সরকারি বাহিনী বিতাড়িত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে এই জাতীয় সশস্ত্র লড়াইয়ের ডাক দেন। একই সঙ্গে হুতি ছেড়ে সরকারি পক্ষে যোগ দেওয়া যোদ্ধাদের জন্য তাৎক্ষণিক সাধারণ ক্ষমার (Amnesty) ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
- 📢 যুদ্ধের ডাক: হুতিদের আগ্রাসনের মুখে ইয়েমেনের সর্বস্তরের জনগণকে সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জাতীয় আহ্বান।
- 🤝 সাধারণ ক্ষমা: হুতি বাহিনীর যেসব যোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করে পক্ষ ত্যাগ করবে, তাদের জন্য অবিলম্বে ক্ষমা ঘোষণা।
- 🌊 কৌশলগত ক্ষতি: সেপ্টেম্বরে হুতিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ মোকখা (Mocha) শহর এবং ময়্যুন দ্বীপের (Mayyun Island) পতন।
- ⚓ বাব আল-মানদেব সংকট: বৈশ্বিক নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ও সৌদি আরব ঝুঁকিতে।
- 🛡️ আন্তর্জাতিক তৎপরতা: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিদেশীয় মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠক।
লোহিত সাগরে হুতিদের আধিপত্য ও সানা পুনরুদ্ধারের সংকল্প
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় অগ্রগতি লাভ করে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী মোকখা এবং কৌশলগত ময়্যুন দ্বীপ দখল করে নেয়। ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর গত ১২ বছরের লড়াই আবার নতুন ও চরম বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। এই অগ্রগতির মাধ্যমে হুতিরা ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যকার সংযোগস্থল বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বৈশ্বিক তেল ও বাণিজ্যিক সরবরাহের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি এই পরিস্থিতিকে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—দেশের রাজধানী সানা সহ পুরো ভূখণ্ডে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বহাল করা।”
হুতি যোদ্ধাদের সাধারণ ক্ষমা ও সামাজিক সমীকরণ
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের দলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে হুতিদের এই অগ্রযাত্রার সময়ে গণহারে পক্ষ ত্যাগ করার সম্ভাবনা কম হলেও ইয়েমেনের উপজাতীয় ও গোত্রীয় (Tribal) সমাজব্যবস্থার কারণে সাধারণ ক্ষমার এই অফারটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারা শিবান জানান, “ইয়েমেন মূলত একটি গভীর গোত্রভিত্তিক সমাজ। এই সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে সরকার এই বার্তাই দিচ্ছে যে, সাধারণ যোদ্ধারা ফিরে এলে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হবে না, যা সংঘাতকে রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় প্রতিশোধের পথ থেকে রক্ষা করতে পারে।”
সৌদি আরবের নিরাপত্তা শঙ্কা ও সামরিক জোটের তৎপরতা
হুতিদের এই অগ্রগতি সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর সরাসরি আঘাত এনেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের ইয়ানবু ও তায়েফ অঞ্চল লক্ষ্য করে হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছে রিয়াদ। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনের এই সংঘাত সৌদি আরবের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির নিরাপত্তার জন্য বড় বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই সংকট মোকাবেলায় গত আগস্টে গঠিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় তিন দেশের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি কোনো দেশই ইয়েমেনের মাটিতে সরাসরি পদাতিক সৈন্য পাঠাবে না; তাদের সমর্থন মূলত কারিগরি সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইয়েমেন সংঘাত ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সাময়িক চিত্র
| বিষয় / ঘটনা | সংশ্লিষ্ট পক্ষ / অঞ্চল | বর্তমান প্রভাব ও গুরুত্ব |
|---|---|---|
| সাধারণ সামরিক সমাবেশ | রাশাদ আল-আলিমি (ইয়েমেন সরকার) | হুতিদের বিরুদ্ধে সানা পুনরুদ্ধারে দেশবাসীকে জাতীয় সশস্ত্র আহ্বানের ডাক। |
| কৌশলগত অঞ্চলের পতন | মোকখা শহর ও ময়্যুন দ্বীপ | হুতিদের দখলে; বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। |
| পক্ষত্যাগীদের ক্ষমা অফার | হুতি যোদ্ধা ও সরকার | গোত্রীয় প্রতিশোধ এড়াতে তাৎক্ষণিক সাধারণ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি। |
| জরুরি প্রতিরক্ষা বৈঠক | সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান | মক্কা চুক্তির আওতায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ত্রিদেশীয় যৌথ পদক্ষেপ। |
