![]()
জেমস আব্দুর রহিম রানা: যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে আশার আলো দেখেছিলেন কৃষকেরা। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা কাটিয়ে বিলাঞ্চলের তুলনামূলক উঁচু জমি ও মৎস্য ঘের থেকে পানি নিষ্কাশন করে দেরিতে হলেও ধান আবাদ করেছিলেন তারা। কিন্তু মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে টানা ঝড়-বৃষ্টি সেই আশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ধান এখন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেতেই ধান পড়ে গেছে, কোথাও আবার ভেসে যাচ্ছে কষ্টার্জিত ফসল।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার চাষাবাদের খরচ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। সেচ, সার, কীটনাশক ও জমি প্রস্তুতসহ প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় গুনতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরি। ফলে ফসল ঘরে তুলতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
কুলটিয়া ইউনিয়নের লখাইডাঙ্গা গ্রামের এক কৃষক জানান, বিলের জমি থেকে পানি সরাতে আলাদা খরচ করে ধারদেনা নিয়ে আড়াই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। জমিতে ভালো ফলনের সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু হঠাৎ টানা বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় নিজেই কাঁধে করে ধান তুলে আনার চেষ্টা করছেন তিনি।
একই এলাকার আরেক চাষী বলেন, চার বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন অনেক আশা নিয়ে। ধানও ভালো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পুরো জমিতে পানি জমে গেছে। সময়মতো ধান কাটতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এই শঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড়।
নেহালপুর ও আশপাশের এলাকার কৃষকেরাও একই চিত্র তুলে ধরেছেন। ঝড়ো হাওয়ায় অনেক ক্ষেতেই পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় কাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ভবদহ অধ্যুষিত বিলাঞ্চলের কুলটিয়া, হরিদাসকাটি, নেহালপুর, মনোহরপুর, ঢাকুরিয়া, দূর্বাডাঙ্গা ও খানপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবার সেচের মাধ্যমে পানি সরিয়ে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। বিশেষ করে বিল বোঁকড়, বিল কেদারিয়া, আড়পাতার বিল, হরিণার বিল, সামন্দডাঙ্গা বিল ও বিল শালিখাসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকায় কৃষকেরা বাড়তি খরচ করে জমি প্রস্তুত করেন। লক্ষ্য ছিল মৌসুম শেষে ভালো ফলন ঘরে তোলা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া সেই পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে কিছু এলাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকদের ধাপে ধাপে ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে আবহাওয়া সামান্য অনুকূলে এলেই দ্রুত ফসল সংগ্রহ করা যায়।
কৃষকদের দাবি, ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে প্রতি বছরই এমন ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি প্রণোদনা ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, মৌসুমের শেষ সময়ে এসে প্রকৃতির অনিশ্চয়তায় ভবদহের কৃষকদের মুখে হাসি ফোটার সম্ভাবনা অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। এখন তাদের একটাই অপেক্ষা—কয়েকটি রোদেলা দিন, যাতে অন্তত বাকি ফসলটুকু ঘরে তুলতে পারেন।
