![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
রাজনৈতিক দল করার অধিকার সবার আছে। মতাদর্শ থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকবে, দলের ঘোষিত এজেন্ডা বাস্তবায়নে মানুষ কাজ করবে—এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক চিত্র। তবে সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে কেউ যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা কিংবা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করাই কি বিচারের কারণ হতে পারে?
বর্তমান সরকারের কাছে এ প্রশ্নটি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গত সময়ে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার হওয়া জরুরি। অপরাধী যে দলেরই হোক, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা জরুরি—রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের বিকল্প প্রমাণে পরিণত না হয়।
কেউ রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে থেকে রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করেছেন, অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করেছেন—শুধু এই পরিচয়ের কারণে তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হলে ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন উঠবে ভবিষ্যতে। রাজনৈতিক মত, দলীয় আনুগত্য ও ফৌজদারি অপরাধ—তিনটি বিষয়কে একই পাল্লায় মাপা হলে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক। আজ যারা ক্ষমতায়, ভবিষ্যতে তারাও বিরোধী দলে থাকতে পারেন। তাই এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিচারের মানদণ্ডও পরিবর্তিত হবে না।
অপরাধের বিচার হোক—কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচার নয়।
প্রতিটি অভিযোগের পেছনে থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট অপরাধ, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা কোনো দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে একা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসন—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হবে।
রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করা আর রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ করা এক বিষয় নয়। একইভাবে রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাও নিজে কোনো অপরাধ নয়—অপরাধ তখনই, যখন আইন ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে।
তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটাই—বিচার হোক নিরপেক্ষভাবে, ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ে নয়; অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে।
অপরাধী হলে শাস্তি পেতেই হবে, সে যেই হোক। আর নিরপরাধ হলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।
কারণ ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তার কাছে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই মুখ্য।
রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মাধ্যম; রাষ্ট্র নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল থাকবে, মতাদর্শ থাকবে, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হবে রাষ্ট্রের স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন।
তাই যারা অতীতে রাষ্ট্রের আইন ভেঙে অপরাধ করেছে, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি করেছে—তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কোনো দলের, কোনো মতের কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারী—এটি বিচারের ক্ষেত্রে ঢাল হতে পারে না।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা এবং রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা কি নিজেই অপরাধ?
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, দলের নীতি বাস্তবায়নে কাজ করা কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা—এসব কর্মকাণ্ডকে সরাসরি অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা হলে রাষ্ট্র ও দলীয় রাজনীতির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারকে দলীয় প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে রাখা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তার মূল কথা হলো—ব্যক্তি বা দল নয়, রাষ্ট্রের স্থায়ী স্বার্থই সর্বাগ্রে। আজ একটি দল ক্ষমতায়, কাল অন্য একটি দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়, সংবিধান থাকে, জনগণ থাকে, জাতীয় স্বার্থ থাকে। তাই এমন কোনো বিচারপ্রক্রিয়া কাম্য নয়, যা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞাও পাল্টে দেয়।
অপরাধের বিচার হবে কঠোরভাবে—কিন্তু সেই বিচার হতে হবে প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার আড়ালেও রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত হতে হবে।
সরকারের দায়িত্ব প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—সকলের জন্য একই আইন কার্যকর থাকবে। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের নয়; রাষ্ট্র জনগণের।
আমাদের প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট—অপরাধী যে-ই হোক, বিচার হোক। নিরপরাধ যে-ই হোক, তার অধিকার সুরক্ষিত থাকুক। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধতাই হোক চূড়ান্ত মানদণ্ড।
দল আসবে, দল যাবে—রাষ্ট্র থাকবে।
তাই রাষ্ট্রের স্বার্থই হোক সবার আগে।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]
