![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস আসে, নানা আয়োজন হয়, সেমিনার হয়, র্যালি হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার নানা আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব আনুষ্ঠানিকতা ও প্রতীকী কর্মসূচির বাইরে আমরা বাস্তবে কতটুকু পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছি? একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কি পরিবেশকে জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পেরেছি?
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামরিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং নাগরিকদের জীবনমানও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পরিবেশ রক্ষা কোনো আলাদা কর্মসূচি নয়, এটি রাষ্ট্র গঠনেরই একটি মৌলিক উপাদান।
বাংলাদেশ প্রায় আঠারো কোটি মানুষের দেশ। যদি এই আঠারো কোটি মানুষ প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ এবং তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তাহলে দেশে আঠারো কোটি নতুন বৃক্ষ সংযোজিত হতে পারে। এটি কোনো কল্পনা নয়; এটি একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় কর্মসূচি হতে পারে। রাষ্ট্র চাইলে এটিকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে পারে। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি সুসংগঠিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। নিজেদেরকে দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে হবে।
পরিবেশ দিবসের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সচেতনতা সৃষ্টি নয়, বরং বাস্তব ফলাফল অর্জন। আমরা এমন একটি সংস্কৃতির মধ্যে আটকে গেছি যেখানে দিবস পালনই মুখ্য হয়ে উঠেছে, অথচ দিবসের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন গৌণ হয়ে গেছে। পরিবেশ দিবসের র্যালি শেষ হলে যদি একটি গাছও রোপণ না হয়, নদী দূষণ কমানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, বনভূমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সেই আয়োজনের প্রকৃত মূল্য কতটুকু?
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তাধারা আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পদ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্পদও জাতীয় সম্পদ। গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, মাটি রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ নিশ্চিত করে। তাই বৃক্ষরোপণকে দান-খয়রাত বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ হিসেবে নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি দুর্বল পরিবেশ কখনো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে না। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়।
বাংলাদেশ প্রায় আঠারো কোটি মানুষের দেশ। যদি প্রত্যেক নাগরিক অন্তত একটি করে গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়, তাহলে দেশে আঠারো কোটি নতুন বৃক্ষ যুক্ত হতে পারে। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো প্লাস্টিক দূষণ। আজ আমাদের শহর, গ্রাম, খাল, বিল, নদী এমনকি কৃষিজমিও প্লাস্টিক বর্জ্যে আক্রান্ত। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে প্রকৃতিকে করেছে বিপন্ন। বাজারের পলিথিন, পানির বোতল, খাবারের মোড়ক, প্লাস্টিক কাপ ও প্লেট বছরের পর বছর মাটিতে পড়ে থেকে পরিবেশের ক্ষতি করছে। এগুলো মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে এবং নদী-খাল ভরাট হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ আইন একা পরিবেশ রক্ষা করতে পারে না; নাগরিক দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নদীগুলোও আজ মারাত্মক সংকটের মুখে। শিল্পবর্জ্য, পলিথিন, দখল ও দূষণের কারণে বহু নদী তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। অথচ নদী এই রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, মৎস্যসম্পদ বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কোনো পরিবেশবাদী স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্র রক্ষার অপরিহার্য অংশ।
একইভাবে বায়ুদূষণ আজ জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। ইটভাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। পরিবেশ দূষণের ফলে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ছে, কর্মক্ষমতা কমছে এবং উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নেরও একটি শর্ত।
মাটিদূষণ এবং কৃষিজমির অবক্ষয়ও উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য এবং প্লাস্টিকের কারণে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। যে রাষ্ট্র তার কৃষিজমি রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রাষ্ট্রীয়বাদী দর্শন বলে, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয় সম্পদ। বনভূমি, নদী, পাহাড়, কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য—সবকিছুই রাষ্ট্রের শক্তির উৎস। এগুলো ধ্বংস হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস নয়, বরং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শুধু র্যালি নয়, বাস্তব কাজ; শুধু বক্তৃতা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ; শুধু সচেতনতার কথা নয়, বাস্তবায়নের সংস্কৃতি। সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আঠারো কোটি মানুষের জন্য আঠারো কোটি গাছ, প্লাস্টিকমুক্ত জনপদ, দূষণমুক্ত নদী, পরিচ্ছন্ন বায়ু এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
পরিবেশ দিবসের প্রকৃত সাফল্য দিবস পালনে নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার এজেন্ডা বাস্তবায়নে। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। তাই এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের শপথ হোক—দিবস নয়, দায়িত্ব; স্লোগান নয়, কর্ম; আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তবায়ন। একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামই হোক আমাদের পরিবেশ দিবসের প্রকৃত প্রতিজ্ঞা।
সরকার একা পরিবেশ রক্ষা করতে পারবে না।জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যখন যে সরকার-ই আসুক না কেন, সে সরকারকে নিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার জাতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকারি পরিকল্পনার পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলায় বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি তা বাঁচিয়ে রাখার জন্যও জবাবদিহিতা থাকতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—শুধু দিবস পালন নয়, এজেন্ডা বাস্তবায়ন। শুধু বক্তব্য নয়, কর্মসূচি। শুধু ব্যানার নয়, বৃক্ষ। শুধু প্রতীকী আয়োজন নয়, রাষ্ট্রব্যাপী পরিবেশ পুনরুদ্ধার আন্দোলন।
রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। আর পরিবেশ রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ। আসুন, এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা নতুন শপথ গ্রহণ করি—আঠারো কোটি মানুষের জন্য আঠারো কোটি গাছ, একটি সবুজ বাংলাদেশ এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করব। দিবস পালন নয়, বাস্তবায়নই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]
