![]()
আকাশেবাতাসে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস। ভয়াবহ পাহাড় ধস এবং আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নেপালের ত্রিশূলী ৩-এ (Trishuli 3A) হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন থেকে সম্পূর্ণ অলৌকিক উপায়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই শ্রমিককে। আন্তর্জাতিক টানেলিং বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স (Arnold Dix) এই রোমাঞ্চকর উদ্ধারকাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে বলেছেন, “এটি যেন অলৌকিক ঘটনার ওপর আর এক স্তর অলৌকিকতা!”
উদ্ধার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন সঞ্জয় শাহ (৩০) ও কবির মহারজন (৪৫)। বানের জলে পথঘাট মুছে যাওয়ার ৯ দিন পর তাদের সুরঙ্গ থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে।
🚨 উদ্ধার অভিযানের ৫টি প্রধান চ্যালেঞ্জ
নেপাল সেনা ও বিশেষজ্ঞদের সামনে প্রতিটি পদক্ষেপে মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছিল প্রকৃতি। ঠিক কীভাবে পরিচালনা করা হলো এই উদ্ধার কাজ?
১. ‘সুরঙ্গের মুখটাই তো গায়েব!’
আকস্মিক বন্যায় প্রায় ১,৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ভূ-প্রকৃতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আর্নল্ড ডিক্স জানান, “এমন উদ্ধারকাজ আমি আগে কখনও দেখিনি, যেখানে পাহাড়ের ওপর থাকা একটি সুরঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করতে আমাদের নতুন করে মাটি খুঁড়তে হয়েছে।” পুরনো স্যাটেলাইট ইমেজ, টপোগ্রাফিক ম্যাপ এবং হেলিকপ্টারের ড্রোন ফুটেজ মিলিয়ে উদ্ধারকারীরা প্রথমে সুড়ঙ্গের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করেন।
২. বিস্ফোরক দিয়ে পথ তৈরি
সুরঙ্গের মুখ জুড়ে আটকে ছিল গাড়ির চেয়েও বড় বড় পাথর ও কাদা। ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের নিরাপত্তার স্বার্থে সুড়ঙ্গে সাধারণতঃ বিস্ফোরক ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু নেপালি সেনাবাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত গাণিতিক পরিমাপে বিস্ফোরক ব্যবহার করে ধস সরিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ তৈরি করে।
৩. সুরঙ্গজুড়ে শুধুই জল
সুরঙ্গটি প্রায় পুরোটাই জলে ভর্তি ছিল। উদ্ধারকারীরা বিশাল এক্সকাভেটর ও পাম্প মেশিন দিয়ে বাইরের নদী পর্যন্ত একাধিক ক্যানেল বা ড্রেন কেটে জল নিষ্কাশন করেন।
৪. ছাদ ঘেঁষে ‘মানব সুরঙ্গ’
ঝুঁকি কমাতে উদ্ধারকারী দল আসল সুরঙ্গের ছাদ ঘেঁষে মানুষের দেহের আকারের একটি ছোট্ট সাব-টানেল (Mini-Tunnel) তৈরি করে। এতে সুরঙ্গ ধসে পড়া ও আবার জল জমার ঝুঁকি কমে যায়।
৫. সেই মাহেন্দ্রক্ষণ: “আমরা এসে গেছি!”
শুক্রবার ভোরে সুরঙ্গের গভীর থেকে মৃদু আওয়াজ শুনতে পান উদ্ধারকারীরা। সেনা জওয়ানরা চিৎকার করে বলেন, “চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি!” ভেতর থেকে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে ভেসে আসে একটি মাত্র শব্দ— “ঠিক আছে” (Okay / Hunchha)। কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবিত উদ্ধার করা হয় সঞ্জয় ও কবিরকে।
🎯 পরবর্তী লক্ষ্য: ‘গোল্ডিলকস জোন’
উদ্ধারকারীদের মতে, অভিযান মাত্র শুরু হয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
-
দূরত্ব বাকি: প্রবেশপথ থেকে এখন পর্যন্ত ৬০ মিটার পথ খোঁড়া সম্ভব হয়েছে, ভেতরে পাওয়ার স্টেশনে পৌঁছাতে আরও ১৫০০ মিটার যেতে হবে।
-
আশা যেখানে: ডিক্সের মতে, টিম এখন পাহাড়ের ভেতরের ‘গোল্ডিলকস জোন’ (Goldilocks Zone)-এর দিকে এগোচ্ছে। পাওয়ার হাউসের একদম ওপরের স্তরে বায়ু চলাচলের সুযোগ ও খালি জায়গা রয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
-
বিপদের ঝুঁকি: ভেতরে আচমকা জল জমে শ্বাসরোধের আশঙ্কা রয়েছে, আবার বাইরে বৃষ্টি হলে পেছন দিক থেকেও জল ঢুকে প্লাবিত হতে পারে।
“যদি এটা ক্যাসিনোর খেলা হতো, অনেকে হয়তো এখন হাত তুলে ছিটকে যেত। কিন্তু আমরা বলছি— খেলা এখনও বাকি, আমরা শেষ দেখে ছাড়ব!”
— আর্নল্ড ডিক্স (টানেলিং বিশেষজ্ঞ)
📌 এক নজরে উদ্ধার অভিযান
| মূল তথ্য | বিবরণ |
| ঘটনাস্থল | ত্রিশূলী ৩-এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নেপাল |
| উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি | সঞ্জয় শাহ ও কবির মহারজন |
| প্রধান উপদেষ্টা | আর্নল্ড ডিক্স (International Tunnelling Association) |
| মূল চ্যালেঞ্জ | কাদা-পাথরে ঢাকা প্রবেশপথ, জলের উপস্থিতি, পুনরায় ধস নামার আশঙ্কা |
| বর্তমান অবস্থান | ‘গোল্ডিলকস জোন’-এর দিকে এগিয়ে চলেছে উদ্ধারকারী দল |
