![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে যে রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আড়াই শতাব্দী পরে সেই রাষ্ট্র আজ বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির অন্যতম নিয়ামক। এই দীর্ঘ পথচলা শুধু একটি দেশের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্র নির্মাণ, জাতীয় ঐক্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মতপার্থক্য, গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাত—কোনোটিই অনুপস্থিত ছিল না। তবুও একটি বিষয় বারবার প্রমাণিত হয়েছে—রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্নে তারা আপস করেনি। ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, নীতির পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি অটুট থেকেছে।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ বা সামরিক শক্তির ওপর নয়; বরং জাতীয় পরিচয়, আইনের শাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তার ওপর। যে রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করে, সেই রাষ্ট্রই বিশ্বমঞ্চে টেকসই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
আজকের বিশ্ব ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি। জাতীয় উন্নয়নকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের জন্যও এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমাদের রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সুশাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান অপরিহার্য।
আমেরিকার ২৫০ বছরের যাত্রা নিখুঁত ছিল না। তাদের ইতিহাসে বিতর্ক, বৈষম্য এবং নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি সংকট মোকাবিলায় তারা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পথেই এগিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য চিন্তার খোরাক।
রাষ্ট্রের শক্তি কখনো কেবল অস্ত্রের শক্তি নয়; এটি মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা। যে জাতি তার ইতিহাসকে ধারণ করে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে, সেই জাতিই দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বসভায় সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি তাই শুধু একটি উৎসব নয়; এটি রাষ্ট্র গঠন, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্র রেখে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক বার্তা। বাংলাদেশেরও প্রয়োজন এমন এক রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে রাষ্ট্র, সংবিধান, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ। এই পথেই একটি আত্মমর্যাদাশীল, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হতে পারে।
[এটি সম্পূর্ণ নিরীক্ষণ রিপোর্ট]
