![]()
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চীনের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন ৪৮ বছর বয়সী দং মিন। তবে কাজের চেনা ছক ও তীব্র মানসিক চাপ পেছনে ফেলে তিন বছর আগে এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন তিনি—ছেড়ে দেন ডাক্তারি পেশা। এরপর খুলে বসেন ঐতিহ্যবাহী চায়নিজ স্টিমড বান বা ভাপা রুটির দোকান।
সফলতার মুখ দেখতেও বেশি সময় লাগেনি। প্রতিযোগিতাপূর্ণ খাদ্যশিল্পে নিজের অবস্থান শক্ত করে চলতি বছরের জুলাই মাসে দ্বিতীয় শাখাও চালু করেছেন তিনি।
চীনা সংবাদমাধ্যম চাংজিয়াং ডেইলি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দং মিন বলেন, “ডাক্তার থাকার সময় প্রায়ই মনে হতো চাকরি ছেড়ে দিই। এখন বানের দোকান চালাতে গিয়ে শরীর ক্লান্ত হলেও মানসিক তীব্র প্রশান্তি পাই, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
চিকিৎসাসেবা থেকে রুটির দোকানে
১৯৯৯ সালে উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুল থেকে পাশ করেন দং। এরপর শেনজেনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েক বছর পর উহানে ফিরে মায়ের একটি বেসরকারি ক্লিনিক পরিচালনায় সাহায্য করার পর, তিনি হুবেই প্রদেশের তিয়ানমেনে এক ছোট কমিউনিটি হাসপাতালে আইনি প্রতিনিধি ও চিকিৎসক পদে যোগ দেন।
তবে চিকিৎসাসেবার আড়ালে থাকা প্রশাসনিক চাপ এবং চীনে হাসপাতাল ও রোগীদের মধ্যবর্তী চরম টানাপোড়েন তাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তোলে।
দং মিন বলেন, “রোগী দেখার পাশাপাশি সরকারি সংস্থার ঘন ঘন পরিদর্শন সামলানো এবং প্রশাসনিক ঝুটঝামেলাই বেশি শক্তি কেড়ে নিত। আর কোনো আইনি সমস্যা বা বিরোধ তৈরি হলে সব দায় এসে পড়ত আমার ওপর।”
২০২৩ সালে এক বন্ধুর অনুপ্রাণিত হয়ে বানের ব্যবসায় নামেন তিনি। শুরুতে বিনিয়োগকারী হলেও হঠাৎ দোকানের প্রধান রাঁধুনি চাকরি ছেড়ে দিলে দং নিজেই বান তৈরি শেখা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই রান্না এবং বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় আনন্দ খুঁজে পান তিনি।
পরিবারের অসম্মতি ও জীবনদর্শন
চীনে চিকিৎসকের পেশাকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মনে করা হলেও, দং যখন এই পেশা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, শুরুতে তার পরিবার এতে রাজি হয়নি।
তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে দং বলেন, “আমার বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। জীবনের বহু অভিজ্ঞতা ঝুলিতে জমেছে। তাই অন্য কে কী ভাবল, তা নিয়ে আমি ভাবি না। আমি শুধু এমন একটি জীবন চাই, যা আমি ভালোবাসি এবং নিজের জন্য বাঁচতে পারি।”
বর্তমানে তার পরিবারও এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে এবং ব্যবসায় তাকে নিয়মিত সাহায্য করছে। “জীবনে পরিবর্তনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। যতদিন শারীরিক সক্ষমতা থাকবে, আমি এই দোকান চালিয়ে যাব,” যোগ করেন তিনি।
চীনে চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কাঠামোগত সংকট
দং মিনের এই গল্প চীনে একা কোনো ঘটনা নয়। সম্প্রতি চীনে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, কম বেতন এবং আইনি ও প্রশাসনিক চাপের কারণে পেশা বদলের একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালেও ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউউ শহরের এক চিকিৎসক ১৩ বছরের চাকরি ছেড়ে রাস্তার পাশে খাবারের দোকান খুলে বসেন। তিনি জানান, হাসপাতালে মাসে ১০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ১,৫০০ ডলার) উপার্জনের চেয়ে এই ব্যবসায় তার আয় অনেক বেশি এবং মানসিক চাপও কম।
চীনের চিকিৎসকদের একটি সামাজিক মাধ্যম নেটওয়ার্ক ‘শিং লিন ইউয়ান কমিউনিটি’ এক মন্তব্যে জানায়, “ডাক্তাররা শুধু শারীরিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও চরম ক্লান্তিতে ভোগেন। দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় পর্যাপ্ত আয় না থাকা এবং চিকিৎসাবহির্ভূত কাজের পাহাড় সামলানো—সব মিলিয়ে এটি কোনো ব্যক্তিসংকট নয়, চীনের চিকিৎসা খাতের কাঠামোগত সংকট।”
