![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
রাষ্ট্রীয়বাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে শুধু একটি তথ্যপ্রচারকারী মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি রাষ্ট্রের আদর্শ, জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ আজ যা দেখে, পড়ে ও শোনে—তার একটি বড় অংশই তাদের চিন্তা, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে। তাই রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তাধারায় গণমাধ্যমের দায়িত্বও অনেক বড়। এখানে ব্যক্তিগত লাভ, করপোরেট প্রতিযোগিতা বা সাময়িক জনপ্রিয়তার চেয়ে রাষ্ট্র ও জাতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয়বাদী আদর্শের মূলভিত্তি হলো জাতীয় ঐক্য। এই আদর্শ কখনোই পারস্পরিক বিদ্বেষ, বিভাজন বা ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতাকে সমর্থন করে না। অথচ বর্তমান সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু গণমাধ্যম নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য অন্য গণমাধ্যমকে ছোট করার প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কারো সংবাদকে বিদ্রূপ করছে, কেউ আবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের ভুলকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় করে উপস্থাপন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এক ধরনের অশোভন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেদের প্রচারের জন্য অন্যের দুর্বলতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি শুধু অনৈতিকই নয়, বরং পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য ক্ষতিকর।
রাষ্ট্রীয়বাদী সমাজে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে গঠনমূলক। একটি গণমাধ্যম অন্য একটি গণমাধ্যমের চেয়ে ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে পারে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, আরও দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দিতে পারে—এটাই সুস্থ প্রতিযোগিতা। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপমান করে, হেয় করে কিংবা পরিকল্পিতভাবে বিতর্ক তৈরি করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা কখনোই সুস্থ সাংবাদিকতা নয়। কারণ এতে জনগণের কাছে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যায়। মানুষ যখন দেখতে পায় যে সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেরাই একে অপরকে অবিশ্বাস করছে, তখন তারা পুরো সংবাদব্যবস্থাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এটি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি। একটি দেশের গণমাধ্যম যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সেই দেশের তথ্যব্যবস্থা দুর্বল বলে বিবেচিত হয়। বিদেশি শক্তি তখন সহজেই সেই বিভক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তথ্যযুদ্ধ চলছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের গণমাধ্যম যদি নিজেদের মধ্যেই লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে বিদেশি অপশক্তির জন্য কাজ সহজ হয়ে যায়। তারা বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে, ভুয়া তথ্য প্রচার করতে পারে এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তৈরির সুযোগ পায়।
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তাধারা আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরস্পরের পরিপূরক। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গণমাধ্যম—সবাই মিলে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে তোলে। তাই একটি গণমাধ্যম যদি অন্য একটি গণমাধ্যমকে ধ্বংস করার মানসিকতায় কাজ করে, তাহলে মূলত তারা নিজেদের ক্ষেত্রকেই দুর্বল করছে। এটি আত্মঘাতী প্রবণতা ছাড়া আর কিছু নয়।
রাষ্ট্রীয়বাদী মূল্যবোধে দায়িত্বশীলতা একটি বড় গুণ। একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক যখন কলম ধরেন, তখন তার লেখা শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি জনমত গঠন করে, মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে এবং অনেক সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতা। স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করাই হবে প্রধান কাজ। বরং প্রকৃত স্বাধীনতা হলো সত্য প্রকাশের সাহস, দায়িত্বশীল সমালোচনা এবং জাতির কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
রাষ্ট্রীয়বাদী সমাজব্যবস্থায় সমালোচনা অবশ্যই থাকবে। কারণ সমালোচনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান উন্নত হতে পারে না। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে শালীন, তথ্যভিত্তিক এবং গঠনমূলক। ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে পরিচালিত সমালোচনা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। আজ আমরা দেখতে পাই, অনেক সময় একটি গণমাধ্যম অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করে, যেন সেটি জনগণের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের অংশ। এই সংস্কৃতি সাংবাদিকতার মর্যাদা নষ্ট করছে।
রাষ্ট্রীয়বাদী দর্শনে গণমাধ্যমকে জাতির শিক্ষক বলা যায়। কারণ জনগণের বড় একটি অংশ গণমাধ্যম থেকেই শিক্ষা নেয়—কী সঠিক, কী ভুল, কী নৈতিক এবং কী অনৈতিক। যদি গণমাধ্যম নিজেরাই অসহিষ্ণু আচরণ করে, তাহলে সমাজেও অসহিষ্ণুতা বাড়বে। যদি তারা প্রতিহিংসা ও অপমানের সংস্কৃতি চালু করে, তাহলে সমাজেও সেই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়বে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল খবর প্রকাশ করা নয়; বরং একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রীয়বাদী চেতনায় দেশপ্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকৃত দেশপ্রেম কখনো নিজের স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে স্থান দেয় না। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম জানে যে, তার প্রতিটি শব্দ দেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করে। তাই তারা এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ায় না, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নষ্ট করে বা জনগণের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বরং তারা সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সমাজে স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচকতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
আজকের ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রচারের গতি অনেক বেড়ে গেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মুহূর্তেই একটি তথ্য কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় শুধু ভিউ বাড়ানোর জন্য কিংবা ট্রেন্ডে আসার জন্য কিছু মাধ্যম অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করে, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় কিংবা অন্য গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে। এতে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। আর জনগণের আস্থা হারালে কোনো গণমাধ্যমই টিকে থাকতে পারে না।
রাষ্ট্রীয়বাদী আদর্শে সহযোগিতা একটি বড় শক্তি। একটি দেশের গণমাধ্যমগুলো যদি পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখায়, তথ্য আদান-প্রদানে সহযোগিতা করে এবং জাতীয় সংকটে একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে পুরো রাষ্ট্রই উপকৃত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় নিরাপত্তা সংকট, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কিংবা সামাজিক অস্থিরতার সময়ে ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যম রাষ্ট্রকে অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, যেসব দেশে গণমাধ্যম জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, সেসব দেশ সংকট মোকাবিলায় অনেক বেশি সফল হয়েছে।
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তাধারায় ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়, আর প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় রাষ্ট্র। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের স্বার্থে পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনকে বিভক্ত করে, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের পরিপন্থী। সংবাদমাধ্যমের কাজ হওয়া উচিত সত্য, ন্যায় এবং জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো; প্রতিপক্ষকে অপমান করা নয়। কারণ অপমানের রাজনীতি সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী সম্মান এনে দিতে পারে না।
একটি গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। পাঠক বা দর্শক তখনই একটি মাধ্যমকে সম্মান করে, যখন তারা সেখানে সততা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বশীলতা দেখতে পায়। অন্যকে ছোট করে অর্জিত জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু নৈতিকতা ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্জিত মর্যাদা দীর্ঘস্থায়ী। তাই যে গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে বড় হতে চায়, তাকে নিজের মান উন্নয়ন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
রাষ্ট্রীয়বাদী মূল্যবোধ আমাদের শেষ পর্যন্ত এই শিক্ষা দেয় যে, জাতির শক্তি ঐক্যে। বিভক্তি কখনো উন্নয়ন আনে না। একটি দেশের গণমাধ্যম যদি নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের তথ্যব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর দুর্বল তথ্যব্যবস্থা মানেই গুজব, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বিস্তার। তাই আজ সময় এসেছে গণমাধ্যমগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে নৈতিকতার ভিত্তিতে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু তা হবে গঠনমূলক; মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা কখনো জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
অতএব, এক গণমাধ্যমকে ছোট করে অন্য গণমাধ্যম কখনো প্রকৃত অর্থে বড় হতে পারে না। প্রকৃত উন্নতি আসে সততা, পেশাদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকার থেকে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম। কারণ গণমাধ্যম যখন রাষ্ট্রের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে, তখনই জাতি এগিয়ে যায় উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও মর্যাদার পথে।
