![]()
ফুসফুসের ক্যানসারকে সাধারণত ধূমপায়ীদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ধূমপান করেন না, এমন ব্যক্তিরাও এই ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান এবং রান্নার সময় তৈরি হওয়া ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ—এসব কারণ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বায়ুদূষণ কীভাবে বাড়ায় ক্যানসারের ঝুঁকি?
বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম দূষিত কণা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে। যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার নির্গমন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া দূষণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের কোষে প্রদাহ ও অন্যান্য জৈবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিছু দূষক কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রক্রিয়ায়ও ভূমিকা রাখে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে ধূমপান না করলেও দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী ব্যক্তিদের ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
পরোক্ষ ধূমপানও বিপজ্জনক
নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে।
ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুস ছাড়াও মুখ, গলা, খাদ্যনালি, কিডনি, মূত্রথলি এবং শরীরের আরও কয়েকটি অঙ্গের ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া ধূমপান প্রজননস্বাস্থ্যসহ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রান্নার ধোঁয়া থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি
রান্নার সময় তৈরি হওয়া ধোঁয়া ও তেলের অতিরিক্ত উত্তাপে নির্গত বাষ্প দীর্ঘদিন শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে বদ্ধ বা অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত রান্নাঘরে কাঠ, কয়লা, কেরোসিন কিংবা অন্য জ্বালানি পোড়ানোর ফলে ক্ষতিকর কণা ও গ্যাস জমতে পারে।
অতিরিক্ত তাপে তেল পোড়ালে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। এসব ধোঁয়ার সংস্পর্শ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে রান্নার ধোঁয়ার সব ধরনের সংস্পর্শের ঝুঁকি এক নয়; ব্যবহৃত জ্বালানি, বায়ু চলাচল এবং সংস্পর্শের মাত্রার ওপর তা নির্ভর করে।
ঝুঁকি কমাতে রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, কার্যকর এক্সহস্ট ফ্যান বা চিমনি ব্যবহার করা এবং সম্ভব হলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার করা জরুরি।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
ফুসফুসের ক্যানসারের কিছু লক্ষণ অন্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গেও মিলে যেতে পারে। তাই নিচের উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
- দীর্ঘদিন ধরে কাশি থাকা বা কাশির ধরন বদলে যাওয়া।
- কাশির সঙ্গে রক্ত আসা।
- বুকে ব্যথা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া।
- দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা ক্ষুধামন্দা।
- বারবার ফুসফুসের সংক্রমণ হওয়া।
কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, নতুন বা তীব্র শ্বাসকষ্ট কিংবা বুকে তীব্র ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়; তবে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা, ঘরের ভেতরের ধোঁয়া কমানো এবং বায়ুদূষণের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব সীমিত করা ফুসফুসের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। যাঁরা দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে কাজ করেন, তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ধূমপান না করলেই ফুসফুসের ক্যানসার হবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার দূষিত বাতাসে থাকলেই কারও ক্যানসার হবে, এমনও নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, পেশাগত সংস্পর্শ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণও ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
