![]()
ভারতের বিশাল আখ ক্ষেতগুলোতে জীবিকা নির্বাহের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন লাখ লাখ নারী। তবে এর নেপথ্যে রয়েছে এক নির্মম ও অন্ধকারের চিত্র। দক্ষিণ ভারত ও মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আখ কাটা নারী শ্রমিকেরা দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কঠিন শ্রম দিতে গিয়ে মাসিকের সময় ছুটি না পাওয়া, কাজ হারানোর ভয় এবং ঋণের জালে জড়িয়ে চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। পেটের দায়ে ও জীবিকা বাঁচাতে অনেক নারী তাদের শরীর থেকে জরায়ু কেটে ফেলে দেওয়ার (হিস্টেরেকটমি) মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
- 🌾 বিশাল শ্রমবাজার: ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ (১৬%), যেখানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ দৈনিক ১৪ ঘণ্টা করে কাজ করেন।
- ✂️ জরায়ু অপসারণের করুণ বাস্তবতা: ঋতুস্রাবের দিনে ছুটি না পেয়ে মজুরি কাটা ও জরিমানা এড়াতে জরায়ু কেটে ফেলছেন শ্রমিক নারীরা।
- 📊 সরকারি জরিপের পরিসংখ্যান: ২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র সরকারের জরিপে বিদ জেলার ৮২,৩০৯ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ১৩,৮৬১ জন জরায়ু কেটে ফেলেছেন।
- 🔗 ঋণ ও ঠিকাদারের চাপ: অগ্রিম দাদন নেওয়া অর্থ পরিশোধ এবং দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ আখ কাটার চাপে অসুস্থ অবস্থাতেও কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাদের।
ঋণের জাল, দৈনিক মজুরি হারানোর ভয় ও চরম বাস্তবতা
পুরো ভারতজুড়ে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজ করেন। তারা সাধারণত দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করে দৈনিক মাত্র ৪০০ রুপির মতো মজুরি পান। টয়লেট বা সুপেয় পানির সুবিধাহীন অস্থায়ী তাঁবু ও ক্যাম্পগুলোতে বাস করা এসব নারী শ্রমিকদের ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা বা অসুস্থতার দিনেও কোনো ছুটির সুযোগ থাকে না। একদিন কাজ বন্ধ রাখলেই বড় অঙ্কের মজুরি কাটা যায় এবং ঠিকাদারের কাছে জরিমানা গুণতে হয়। এই নির্মম চক্র থেকে মুক্তি পেতে এবং মাঠে টিকে থাকার তাগিদেই পূর্ণিমা, সবিতা ও আশার মতো শত শত নারী জরায়ু কেটে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
‘ডাক্তারদের বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু যন্ত্রণা কমেনি’
অধিকাংশ নারী শ্রমিকদের স্বল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়ার নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয়, যেখানে উপযুক্ত চিকিৎসাগত কারণ ছাড়াই এসব অস্ত্রোপচার করে দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের পরও রক্তপাত ও তীব্র পেটের ব্যথা কমেনি বলে জানান ভুক্তভোগী সবিতা। এমনকি এই অপারেশন করার খরচ মেটাতেও তাদের নতুন করে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। নারী অধিকার কর্মী সঙ্গীতা চৌহান ও রাজনীতিবীদ ড. নীলম গোরহের অনুসন্ধানে এই অমানবিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কার্যত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
হাইকোর্টের নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের স্থবিরতা
কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর কাঁচামাল জোগান দেওয়া এই আখের ক্ষেতগুলোতে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ শুধরাতে আইনি তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বোম্বে হাইকোর্ট পরিযায়ী শ্রমিকদের সঠিক নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সরকারকে নির্দেশ প্রদান করলেও বাস্তবে ভুক্তভোগীরা কোনো সহায়তা পাননি। দরিদ্র নারী শ্রমিকরা আজও বেঁচে থাকার তাগিদে নিজেদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে মাঠে নেমে চলেছেন।
আখ কাটা নারী শ্রমিক সংকট সংক্রান্ত তথ্যসংক্ষেপ
| বিষয় / ক্ষেত্র | বিবরণ ও মূল তথ্য |
|---|---|
| প্রধান সংকট | কাজ বাঁচাতে ও মাসিকের কষ্ট এড়াতে নারী শ্রমিকদের জরায়ু অপসারণ (হিস্টেরেকটমি) |
| প্রভাবিত অঞ্চল | বিদ জেলা (মহারাষ্ট্র) ও কর্ণাটকের আখ ক্ষেতসমূহ |
| সরকারি জরিপ (মহারাষ্ট্র) | ৮২,৩০৯ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ১৩,৮৬১ জন জরায়ু কেটে ফেলেছেন |
| মূল কারণ | দৈনিক মজুরি হারানোর ভয়, ঠিকাদারের জরিমানা এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ |
