![]()
নিউজ প্রোভাইডার
জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় একটি প্রক্রিয়ার নাম ‘এল নিনো’ (El Niño)। মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই বৈশ্বিক আবহাওয়াগত সংকটটি তৈরি হয়। সহজ কথায়, এটি মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলের এমন এক যৌথ ওলটপালট পরিবর্তন, যা পুরো পৃথিবীর স্বাভাবিক আবহাওয়া চক্রকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক অনুষঙ্গটির খুঁটিনাটি ও বাংলাদেশের ওপর এর পরোক্ষ কিন্তু তীব্র প্রভাব নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন:
১. ‘এল নিনো’ কী এবং এর নামকরণের ইতিহাস
স্প্যানিশ শব্দ ‘El Niño’-এর আক্ষরিক অর্থ হলো “ছোট্ট ছেলে” বা “যীশু শিশু”। এই নামকরণের পেছনে রয়েছে এক প্রাচীন ইতিহাস। পেরুর জেলেরা প্রথম লক্ষ্য করেন যে, প্রতি কয়েক বছর পর পর বড়দিনের (ডিসেম্বর) কাছাকাছি সময়ে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিক রকমের গরম হয়ে ওঠে এবং এর ফলে মাছের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। বড়দিনের সময়ে এই পরিবর্তন আসায় যীশু খ্রিষ্টের শৈশবের স্মরণে জেলেরা এর নাম দেন ‘এল নিনো’।
যেভাবে এটি ঘটে:
স্বাভাবিক আবহাওয়ায় পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে (অর্থাৎ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে) শক্তিশালী ‘আয়ন বায়ু’ (Trade Winds) প্রবাহিত হয়, যা সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর বছরগুলোতে এই বায়ুপ্রবাহ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে (আমেরিকার উপকূলের দিকে) গরম পানি জমতে শুরু করে। সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে মেঘ ও বৃষ্টির স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়।
২. বিশ্বমঞ্চে এল নিনোর ধ্বংসাত্মক প্রভাব
এল নিনোর প্রভাবে পৃথিবীর একদিকে যখন তীব্র খরা দেখা দেয়, ঠিক অন্য প্রান্তে তখন শুরু হয় নজিরবিহীন বন্যা:
খরা ও দাবানল: এর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বৃষ্টিপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলস্বরূপ, এসব অঞ্চলে তীব্র পানির সংকট ও বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি হয়।
অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা: ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, ইকুয়েডর এবং আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে। সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি বৃষ্টিপাত ও বিধ্বংসী বন্যা দেখা দেয়।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি: এল নিনোর কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়, যা বিশ্বব্যাপী চলমান “গ্লোবাল ওয়ার্মিং” বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করে।
৩. দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও কৃষিতে বড় ধাক্কা
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি বায়ুর (Monsoon) ওপর নির্ভরশীল। এল নিনো এই মৌসুমি বায়ুপ্রবাহকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে:
দুর্বল বর্ষাকাল: এল নিনোর কারণে ভারত মহাসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়।
রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ: শুষ্ক আবহাওয়া ও মেঘমুক্ত আকাশের কারণে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে নজিরবিহীন ও তীব্র তাপপ্রবাহ (Heatwave) দেখা দেয়।
খাদ্য সংকট ও মূল্যস্ফীতি: পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ধান, গমসহ প্রধান প্রধান ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা পুরো অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪. বাংলাদেশের ওপর এল নিনোর তীব্র ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাব
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হলেও, এল নিনোর পরোক্ষ প্রভাব এ দেশের ওপর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ধীরগতির বিপর্যয় ডেকে আনে:
কম বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরা: এল নিনো সক্রিয় থাকার কারণে বাংলাদেশে বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর ফলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে) পানির স্তর নিচে নেমে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়।
নজিরবিহীন দীর্ঘমেয়াদী তাপপ্রবাহ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (যেমন ২০২৩, ২০২৪ এবং বর্তমান ২০২৬ সালে) বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসে যে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন দাবদাহ দেখা গেছে, তার পেছনে এল নিনোর বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশের তাপমাত্রা অনেক জেলাতেই ৪০° সেলসিয়াস থেকে ৪৩° সেলসিয়াস কিংবা তারও ওপরে উঠে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
কৃষিখাতে বড় বিপর্যয়: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় আমন ও বোরো ধানের জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। বৃষ্টির অভাবে আমন চাষ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বোরো চাষের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া তীব্র গরমে ফসলের পরাগায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সার্বিক ফলন কমে যাচ্ছে।
লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট: নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের (উপকূলীয় এলাকা) নদ-নদীতে সমুদ্রের লোনা পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে। এতে খাওয়ার পানি এবং কৃষিকাজের পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি: অতিরিক্ত গরম এবং সুপেয় পানির সংকটের কারণে ডায়রিয়া, জন্ডিস ও হিট স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যার শিকার হচ্ছে মূলত শিশু ও বৃদ্ধরা।
হিমালয়ের বরফ গলা ও নদীর ভবিষ্যৎ: কম তুষারপাতের কারণে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলতে শুরু করেছে। এটি শুরুতে নদীতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার মতো বড় সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
পরিশেষে:
এল নিনো বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো দৃশ্যমান ঝড় বা সাইক্লোন নিয়ে আসে না; বরং এটি নীরবে তীব্র গরম, খরা, সুপেয় পানির সংকট এবং ফসলহানির মতো এক ধীরগতির কিন্তু মারাত্মক দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনে। দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখনই দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
