![]()
ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক জটিল দোরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছেন। টানা ১৩ দিন ধরে বিমান হামলার পর টানা তিন রাতের সাময়িক বিরতি দিয়ে ওয়াশিংটন একে “কূটনীতির সুযোগ” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনো “সম্পূর্ণ প্রস্তুত” (Locked and Loaded) রয়েছে।
কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে হোয়াইট হাউসের সামনে বিকল্পের পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে।
ওমানে আলোচনার আভাস, কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে অটল তেহরান
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে কিছু নড়াচড়া দেখা গেছে। ইরান নিশ্চিত করেছে যে তারা সম্প্রতি ওমানে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক করেছে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম মূল পথ হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের ওপর নজরদারির বিষয়ে ইরান তাদের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে নারাজ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্র কখনোই যুদ্ধ বা শান্তির সময়সীমা নির্ধারণ করার অধিকার রাখে না।” একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না বলেও তেহরান নিশ্চিত করেছে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতির মূল দিকগুলো:
কূটনৈতিক বিরতি: টানা ১৩ দিন বিমান হামলার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি।
মূল বিরোধ: হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা।
রাজনৈতিক চাপ: আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি।
ট্রাম্পের সামনে ৩টি কঠিন বিকল্প: কোনো পথই মসৃণ নয়
পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাত শেষ করতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে মূলত ৩টি বিকল্প আলোচনায় আসছে, যার প্রতিটিতেই রয়েছে বড় ধরণের ঝুঁকি:
১. অর্থনৈতিক ও মৌলিক অবকাঠামোতে হামলা জোরদার
ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পরিবহন অবকাঠামোতে আঘাত হেনে তেহরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এতে সাধারণ ইরানি নাগরিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন—যাদের সহায়তার কথা ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে বলেছিলেন। এছাড়া মার্কিন অভ্যন্তরীণ হিসাবও বলছে, এতে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে নতিস্বীকার করানো যাবে না।
২. দীর্ঘমেয়াদী সমুদ্র অবরোধ (Blockade)
ইরানের বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ জোরদার করে তাদের অর্থনীতি এবং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) অর্থায়ন বন্ধ করা।
-
ঝুঁকি: এই কৌশল কার্যকর হতে কয়েক মাস লেগে যাবে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা জোরদার করলে বিশ্বজুড়ে আবার জ্বালানি সংকট তীব্র হবে।
৩. পুরনো সমঝোতা স্মারক (MOU) নবায়ন
পুরনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করা। তবে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্দিষ্ট রাজস্ব বা নিয়ন্ত্রণ না পেলে এই চুক্তিতে ফিরবে না। আর ট্রাম্প তেহরানকে এই সুবিধা দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নিজ দলের কঠোর নীতিপন্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বেন তিনি।
মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (DIA)-র সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যে ধরণের বোমারু হামলা চালানো হয়েছে, তা ইরানের কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও উদ্বেগ দেখা গেছে:
-
ভয়েস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জ্যোয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন যুদ্ধ আর না বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
-
মার্কিন গোলাবারুদের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে ড্যান কেইন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
-
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবা দরকার, যা কোটি কোটি ডলার অপচয় না করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেবে।”
মধ্যবর্তী নির্বাচন ও তেলের বাজারে উত্তাপ
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
-
জ্বালানি সংকট: লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে।
-
জনমত: সিবিএস নিউজ/ইউগভ (CBS News/YouGov)-এর সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী:
-
মাত্র ৩১% মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন।
-
৭৬% আমেরিকান মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যতটা সহজ ভেবেছিল, ইরান যুদ্ধ তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।
-
উপসংহার: একটি ‘নো-উইন’ পরিস্থিতি?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো বড় স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে চান, যা ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। কিন্তু স্থলসেনা না পাঠিয়ে এবং কেবল বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে বাধ্য করার যে নীতি তিনি নিয়েছেন, তা কার্যকারী হচ্ছে না।
আসামাজিক (asymmetric) যুদ্ধের সুবিধা নিয়ে ইরান সামান্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে সক্ষম। ফলে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাস পরও ট্রাম্প এমন এক ‘নো-উইন’ বা জয়হীন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন, যেখান থেকে সম্মানজনকভাবে বের হয়ে আসার কোনো সহজ পথ এই মুহূর্তে খোলা নেই।
