![]()
একসময় ইতালির ডানপন্থি রাজনীতির প্রান্তিক ও তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে দেখা যেত জর্জিয়া মেলোনিকে। পরনে কালো স্যুট, পায়ে ভারী কালো বুট—সব মিলিয়ে তার উপস্থিতি ছিল এক আপসহীন রাজনৈতিক নেত্রীর মতো। তবে দেশটির মসনদে বসার পর কেবল মেলোনির রাজনীতিই বদলায়নি, বদলে গেছে তার পোশাকের ধরনও। কট্টর ভাবমূর্তি ভেঙে এখন তিনি বেছে নিয়েছেন শান্ত প্যাস্টেল রঙের স্যুট, ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর পরিমিত ফ্যাশন।
বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির এই বাহ্যিক রূপান্তর মূলত তার রাজনীতিতে নরম, সর্বজনগ্রাহ্য কিন্তু শক্ত কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরিরই এক দৃশ্যমান প্রতিফলন।
রাজনৈতিক অবস্থান ও পোশাকের রূপান্তর
২০২২ সালের অক্টোবরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যখন দায়িত্ব নেন, তখন মেলোনির পরনে ছিল গাঢ় রঙের স্যুট ও ভারী বুট। এটি ছিল ইতালির প্রান্তিক ডানপন্থি রাজনীতি থেকে তার মূলধারায় উঠে আসার প্রতীক।
ক্ষমতায় আসার সময় আশঙ্কা ছিল, তিনি হয়তো চরমপন্থি নীতি গ্রহণ করবেন। কিন্তু বাস্তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং ইউক্রেন ইস্যুতে বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করে মেলোনি নিজেকে একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। একই সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
বর্তমানে তাকে প্রায়ই দেখা যায় হালকা ও প্যাস্টেল রঙের স্যুটে। অনেক সময় তার উঁচু হিলের জুতো ঢাকা পড়ে থাকে চওড়া ট্রাউজারের নিচে। ফ্যাশন সমালোচকদের মতে, এই শান্ত রঙের পোশাক তার মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও কোমলতা আনে, যা কোনো সংঘাত না তৈরি করেই তার প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রকাশ করে।
বিশ্ব রাজনীতিতে পোশাকের ভাষা
পোশাকের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল শুধু মেলোনির একার নয়।
-
ভলোদিমির জেলেনস্কি: রাশিয়া হামলা চালানোর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সব সময় সামরিক ধাঁচের পোশাকে উপস্থিত হন।
-
অ্যান্ডি বার্নহাম: যুক্তরাজ্যের এই নতুন প্রধানমন্ত্রী শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের অংশ হিসেবে জিনস ও টি-শার্ট বেছে নেন।
-
ক্লদিয়া শেনবাউম: মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট দেশের বয়ন ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে আদিবাসী কারিগরদের তৈরি নকশা করা পোশাক পরেন।
তবে ফ্যাশন জগতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলোনির পোশাকের এই বার্তা আরও গভীর। ইতালীয়-হাইতিয়ান ডিজাইনার স্টেলা জ্যাঁ বলেন, “যে নারী ইতালির মতো ফ্যাশনের জন্য বিখ্যাত দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তার ফ্যাশন চয়েস অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।”
কর্মী থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক
পোস্ট-ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ইতিহাস থাকায় মেলোনি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে নিয়ে বেশ উদ্বেগ ছিল। কিন্তু তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতামূলক মনোভাব বজায় রেখেছেন এবং মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যেও ইউরোপের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক রিকার্ডো আলকারো বলেন, “যখন তিনি একটি ছোট দলের নেতা ছিলেন, তখন নির্দিষ্ট কিছু উগ্র ভোটারের ওপর তাকে নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এখন তিনি ইউরোপের অন্যতম প্রধান দেশের প্রধান। ফলে তাকে নির্ভরযোগ্য ও কূটনৈতিক সরকারপ্রধান হিসেবে উপস্থাপন করতে হচ্ছে।”
এই ভাবমূর্তির সঙ্গেই বদলেছে তার সাজগোজ। গাঢ় রূপ ছেড়ে তিনি হালকা চুল এবং পরিপাটি স্যুটে আবির্ভূত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
অতীত পেছনে ফেলে মধ্যপন্থায় পদার্পণ
১৯৯৬ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে এক ফরাসি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেলোনিকে সম্পূর্ণ কালো পোশাকে তৎকালীন স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির পক্ষে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। সেই অতীত তাকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সিলভিও বারলুসকোনির সরকারে যুবমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি কিছুটা গম্ভীর ও সাদা-কালো স্যুটে অভ্যস্ত হন। ২০২২ সালের নির্বাচনে নিজেকে “একজন নারী, একজন মা, একজন খ্রিষ্টান” হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি সাধারণ ও রক্ষণশীল মধ্যপন্থিদের মন জয় করেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি কালো বুট বা পুরো কালো স্যুট পরা একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছেন। ইতালিতে কালো রঙ যেমন ফ্যাশনেবল, তেমনি ঐতিহাসিকভাবে এটি ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। তাই মেলোনি বেছে নিয়েছেন নিরপেক্ষ ও প্যাস্টেল শেড।
জি-৭ সম্মেলনের সেই বার্তা
মেলোনির এই আন্তর্জাতিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৪ সালে ইতালির পুগলিয়ায় অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে। বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানানোর সময় তার পরনে ছিল প্যাস্টেল গোলাপি রঙের স্যুট ও পালাজ্জো প্যান্ট।
পরবর্তীতে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁয়ে জি-৭ সম্মেলনে তিনি বেইজ রঙের স্যুটের সঙ্গে একই রঙের টাই পরে হাজির হন। যা দেখে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস মন্তব্য করেছিলেন, “আজ আপনি টাই পরেছেন।”
জবাবে মেলোনি হেসে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, তাই আপনি আমাকে একজন যোদ্ধা ভাবতে পারেন।”
কালো স্যুট ও যুদ্ধংদেহী বুট থেকে শান্ত প্যাস্টেল স্যুটের এই রূপান্তর কেবল মেলোনির ফ্যাশন পরিবর্তন নয়; এটি প্রান্তিক রাজনীতির এক কর্মীর ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
