![]()
নিউজ প্রোভাইডার
দেশের একমাত্র ও সর্ববৃহৎ একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন শেষ পর্যায়ে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী মাসেই প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতে পারে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
তবে প্রতিটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA)। তাই সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জটিল ধাপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প সূত্র অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। চলমান পরীক্ষাগুলোর ইতিবাচক ফলাফলের পর চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত বিভাজন বিক্রিয়া (Nuclear Fission) শুরু হবে। উৎপাদিত তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
এনপিসিবিএল (NPCBL)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর। প্রথম ধাপে ২,০৪৬টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বর্তমানে শেষ ১৮টি জটিল পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে আগামী বছর পর্যন্ত টানা ৭-৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও পর্যবেক্ষণ চলতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য
২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি দেড় বছর পর নতুন জ্বালানি রিফুয়েলিং করতে হবে।
-
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ব্যবহৃত পারমাণবিক বর্জ্য সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে রাশিয়া ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং সেখানে প্রক্রিয়াজাত করে মাটির ৪০০ মিটার নিচে পুঁতে রাখবে। এ বিষয়ে ২০১৭ সালেই রাশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বর্জ্যগুলো রূপপুরে নিরাপদে ১০ বছর পর্যন্ত শীতল করে রাখার অবকাঠামো রয়েছে।
-
জ্বালানি সরবরাহ: পুরো মেয়াদজুড়ে রাশিয়ার কোম্পানি ‘টিভিএল’ জ্বালানি সরবরাহে বাধ্য থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সূচক ধরে দামের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারে আকস্মিক অস্থিরতা তৈরি হলেও বিদ্যুতের উৎপাদনে প্রভাব না পড়ে।
ডলারের প্রভাব ও প্রকল্পের সার্বিক ব্যয়
করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলার সংকটের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলেও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মূল ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার (ডলারের দাম) বৃদ্ধির কারণে টাকার অঙ্কে প্রকল্পের সামগ্রিক খরচ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়। ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের বাড়ানো মেয়াদের মধ্যেই দুই ইউনিট সচল করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
স্পিনিং রিজার্ভ ও জাতীয় গ্রিডের প্রস্তুতি
পাওয়ার গ্রিড পিএলসি জানিয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার সক্ষমতা সম্পূর্ণ তৈরি আছে। দুর্ঘটনাজনিত জরুরি মুহূর্তে ব্যাকআপ হিসেবে ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ (অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা) নিশ্চিতকরণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও পিডিবি সভাপতি নিশ্চিত করেছেন যে, প্রথম পর্যায়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ায় গ্রিড সরবরাহে কোনো ধরনের সংকট হবে না।
সবকিছু ঠিক থাকলে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের এই ঐতিহাসিক ক্ষণটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
