![]()
দেশে ৬৯ শতাংশ মাদকাসক্ত চিকিৎসা চান, সুযোগ পান মাত্র ১৩ শতাংশ: গবেষণা
বাংলাদেশে মাদকনির্ভরশীল ব্যক্তিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সুস্থ জীবনে ফিরতে চিকিৎসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও, বাস্তবতায় সেই সুযোগ পাচ্ছেন খুব সামান্য অংশ। এক সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬৯ শতাংশ মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেতে চান। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই সেবা পৌঁছাচ্ছে মাত্র ১৩ শতাংশের কাছে।
বুধবার ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালস (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। সেপ্টেম্বরের ‘বিশ্ব রিকভারি মাস’ উপলক্ষে রাজধানীর শ্যামলীতে আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অল্প বয়সেই মাদকের বিস্তার
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ।
গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের ওপর নির্ভর করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর বড় অংশই অল্প বয়সে মাদকের সংস্পর্শে আসছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন। এছাড়া উত্তরদাতাদের প্রায় ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের আশপাশে খুব সহজেই মাদক পাওয়া যায়।
তবে মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন এবং ৬২ শতাংশ মানুষ পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা চান। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের কাছে এই সেবা পৌঁছাতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিরাট ব্যবধান দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার চরম ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে তোলে।
| মাদক পরিস্থিতির প্রধান চিত্র | হার / পরিসংখ্যান |
| মোট মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা | প্রায় ৮২ লাখ (জনসংখ্যার ৪.৮৮%) |
| ১৮-২৫ বছর বয়সে মাদক শুরু করেন | ৫৯% |
| ৮-১৭ বছর বয়সে মাদক শুরু করেন | ৩৩% |
| মাদক সহজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন | ৯০% |
| চিকিৎসা বা পুনর্বাসন পেতে ইচ্ছুক | ৬৯% |
| প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসার সুযোগ পান | মাত্র ১৩% |
‘আইনশৃঙ্খলা নয়, দেখতে হবে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে’
অনুষ্ঠানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. এ. মোহিত কামাল মাদকাসক্তদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ‘নেশাখোর’ বা অপমানজনক নামে না ডেকে তাদের অসুস্থ হিসেবে দেখতে হবে। “একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তার পুরো পরিচয় নয়। সামাজিক কলঙ্ক বা ঘৃণা নয়, সহমর্মিতাই পারে তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।”
তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে, চিকিৎসা শেষে যদি একজন ব্যক্তি আবার পুরোনো বিষাক্ত পরিবেশ, বেকারত্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন ও সামাজিক বৈষম্যের মুখে পড়েন, তবে তার আবার মাদকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এজন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা জরুরি।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি সুপারিশ
আলোচনা সভায় উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা বলেন, মাদক সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমনপীড়নের বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে দেখতে হবে।
সভায় নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়:
-
জেলা পর্যায়ে সেবার বিস্তার: প্রতিটি জেলা সরকারি হাসপাতালে অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট ও কাউন্সেলিং সেবা চালু করা।
-
মান নিয়ন্ত্রণ: বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার মান কঠোরভাবে তদারকি করা।
-
বিশেষায়িত সেবা: নারী ও কিশোর-কিশোরীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত ব্যবস্থার আয়োজন করা।
-
দক্ষ জনবল: মাদক নিরাময় ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত সাইকোলজিস্ট ও পেশাদার চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন।
