![]()
নিউজ প্রোভাইডার
মহাশূন্যের জিরো গ্র্যাভিটি বা অতি-ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণ (Microgravity) কেবল মানুষের শারীরিক কাঠামোর ওপরই প্রভাব ফেলে না, এটি চিরতরে বদলে দেয় মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং এর কাজের ধরন। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে টিকিয়ে রাখতে মানুষের মস্তিষ্ক নিজেকে শারীরিকভাবে ‘পুনর্গঠন’ বা রিওয়্যার (Rewire) করে নেয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ‘বীরকবেক’-এর স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গবেষণায় ১৫টি আলাদা মস্তিষ্কের ইমেজিং স্টাডি এবং ৩৭৭ জন মহাকাশচারী ও সিমুলেশনে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের ডেটা বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল নিশ্চিত করা হয়েছে।
মহাকাশে মস্তিষ্কের শারীরিক ও গাঠনিক পরিবর্তন
গবেষণার প্রধান লেখক এবং জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিসা রাফায়েলা ফেরের মতে, শূন্য মাধ্যাকর্ষণে মস্তিষ্কে এক অনন্য ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (Neuroplasticity) দেখা যায়।
১. ভারসাম্য ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র: মস্তিষ্কের যে অংশগুলো মানুষের চলাফেরা, ভারসাম্য এবং শরীরের অবস্থান অনুধাবন নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে বড় ধরনের গাঠনিক ও কার্যকারী পরিবর্তন ঘটে।
২. অপারকুলাম (Operculum) অঞ্চলের পরিবর্তন: মস্তিষ্কের অপারকুলাম অংশেও বড় ধরনের রূপান্তর দেখা গেছে, যেখানে শরীরের পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে আসা বার্তাগুলো একসাথে প্রক্রিয়াজাত হয়।
৩. আচরণগত সামঞ্জস্য: পৃথিবীতে কফির কাপ তোলার মতো সাধারণ কাজে মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ হিসাব করে পেশিকে নির্দেশ দেয়। মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় মস্তিষ্ককে নতুন করে মানিয়ে নিতে হয়।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) মহাকাশচারী লুকা পারমিতানো (যিনি ২০২৭ সালের আর্টেমিস-৩ মিশনের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন) জানান, মহাকাশে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর পরই শরীর ও মস্তিষ্কের মধ্যে এক অদ্ভূত রূপান্তর তিনি নিজে অনুভব করেছেন।
প্রত্যাবর্তনকালীন চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা
গবেষকরা জানান, মহাকাশে মস্তিষ্ক খুব দ্রুত শূন্য মাধ্যাকর্ষণের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন মহাকাশচারীরা পুনরায় পৃথিবী বা চাঁদে ফিরে আসেন।
উদাহরণস্বরূপ, অ্যাপোলো মিশনের মহাকাশচারীদের চাঁদের মাটিতে হাঁটতে গিয়ে ঘন ঘন ভারসাম্য হারানোর প্রধান কারণ কেবল ভারী স্পেসস্যুট ছিল না; বরং তাঁদের মস্তিষ্কের ভারসাম্য ও লোকোমোশন ব্যবস্থা পরিবর্তিত হওয়া এর অন্যতম কারণ ছিল। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ফ্লাইট সার্জন আলেসান্দ্রো আলসিবিয়াদের মতে, “মহাকাশ অভিযানে কার্যকর মস্তিষ্ক নিয়ে যাওয়া এবং তা সচল রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ না করলে পুরো মিশনই ব্যর্থ হতে পারে।”
মঙ্গল বা চাঁদে দীর্ঘমেয়াদী মিশনের ক্ষেত্রে মহাকাশচারীরা যাতে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর দ্রুত স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পান, তা নিশ্চিত করতে এখন নতুন ধরনের নিউরো-এক্সারসাইজ বা স্নায়বিক ব্যায়াম নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
