![]()
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
মা একটি শব্দ নয়, একটি সভ্যতার ভিত্তি। একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের পেছনে যে শক্তি সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করে, তার নাম মা। পৃথিবীর প্রতিটি মহান জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—সেই জাতির মায়েরা সন্তানদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলেছেন বলেই রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে। তাই মা দিবস কেবল আবেগ প্রকাশের একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিকে সম্মান জানানোর দিন।
একজন মা-ই একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। রাষ্ট্রীয় চেতনা, ভাষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রথম শিক্ষা সন্তান মায়ের কাছ থেকেই গ্রহণ করে। পরিবার রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট, আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন মা। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিক কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে মায়ের শিক্ষা ও আদর্শের উপর। যে মা সন্তানকে সত্যবাদিতা শেখান, দেশকে ভালোবাসতে শেখান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখান—সেই মা-ই প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র নির্মাতা।
আজকের আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই শক্তিতে পরিণত হয়, যখন তার সমাজব্যবস্থা নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর এই নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন মায়েরা। কারণ একজন মা কেবল সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একজন নাগরিক তৈরি করেন। সেই নাগরিকই পরবর্তীতে শিক্ষক, চিকিৎসক, সৈনিক, কৃষক, প্রশাসক, সাংবাদিক কিংবা রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়।
আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাসেও মায়েদের অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন কিংবা জাতীয় সংকট—প্রতিটি অধ্যায়ে মায়েরা নীরবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কোনো মা সন্তান হারিয়েছেন দেশের জন্য, কোনো মা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের শিক্ষার জন্য, আবার কেউ অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করে পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাই কোনো না কোনো মায়ের অশ্রু, প্রার্থনা ও ত্যাগ জড়িয়ে আছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে নতুন প্রজন্ম নানা সংকটে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারেন সচেতন মায়েরা। তারা সন্তানদের মধ্যে নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতা জাগিয়ে তুলতে পারেন। কারণ যে সন্তান মাকে সম্মান করতে শেখে, সে রাষ্ট্রকেও সম্মান করতে শেখে। পরিবারে মায়ের অবস্থান দুর্বল হলে সমাজ দুর্বল হয়, আর সমাজ দুর্বল হলে রাষ্ট্রও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মা দিবসে ফুল দেওয়া বা শুভেচ্ছা জানানো নয়; বরং মাতৃত্বের মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণ করা। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা, কর্মজীবী মায়েদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, দরিদ্র ও অসহায় মায়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সন্তান প্রতিপালনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি করা আজ সময়ের দাবি। একটি উন্নত রাষ্ট্র কখনো তার মায়েদের অবহেলা করতে পারে না।
বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মায়েরা আজও অনেক অবহেলার শিকার। তারা পরিবার ও সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন। অথচ একজন কৃষকের মা যেমন রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার পেছনে অবদান রাখেন, তেমনি একজন শ্রমজীবী মায়ের ত্যাগ দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। রাষ্ট্রের প্রতিটি মা-ই জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার।
আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রের উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করি। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র তার মায়েদের মর্যাদা দিতে শেখে। কারণ একজন মা নিরাপদ থাকলে পরিবার নিরাপদ থাকে, পরিবার নিরাপদ থাকলে সমাজ নিরাপদ হয়, আর সমাজ নিরাপদ থাকলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
মা দিবসে রাষ্ট্রের সকল মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। যারা নীরবে পরিবার গড়ে তুলছেন, সন্তানকে মানুষ করছেন, দেশপ্রেম শেখাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রাষ্ট্রের উপযোগী নাগরিকে পরিণত করছেন—তাদের অবদান কোনো দিনই পরিমাপ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি সফলতার পেছনে একজন মায়ের অবিচ্ছিন্ন ত্যাগ জড়িয়ে আছে। তাই মায়ের সম্মান রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল একটি দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রকে এমন এক সামাজিক ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি মা নিরাপদ, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করেন। কারণ, যে রাষ্ট্র তার মায়ের মর্যাদা রক্ষা করে, সেই রাষ্ট্রই ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী ও সম্মানিত হয়ে থাকে।
