![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর অহংকারের অন্যতম প্রতীক ‘জামদানি’। ইউনেস্কো কর্তৃক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই শিল্প শুধু কাপড়ের বুনন নয়, বরং সুতোয় আঁকা এক একটি জীবন্ত কাব্য। তবে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা এই লোকশিল্পের গৌরব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা।
নকশার জাদু ও অনন্য বুননশৈলী
জামদানির মূল বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। কোনো রকম স্কেচ বা গ্রাফ ছাড়াই সম্পূর্ণ মনের মাধুরী মিশিয়ে তাঁতিরা সুতোয় সুতোয় ফুটিয়ে তোলেন ‘পান্না হাজারী’, ‘করলা’, ‘শাপলা ফুল’ কিংবা ‘বুটিদার’ নকশা। একটি মানসম্মত জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুই থেকে তিন জন কারিগরের কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই অসামান্য ধৈর্য আর শৈল্পিক দক্ষতার কারণেই বিশ্ববাজারে এর কদর অনন্য।
বর্তমান সংকট: ন্যায্য মূল্য ও কারিগরদের অনীহা
কাঁচামালের (বিশেষ করে সুতা ও রং) ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে জামদানি উৎপাদনের খরচ দিন দিন বাড়ছে। অথচ সেই তুলনায় মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক কারিগররা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। ফলে নতুন প্রজন্ম এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে।
এছাড়া বাজারে আসল জামদানির নামে কম দামি মেশিনে বোনা ‘নকল জামদানি’র ভিড় আসল কারিগরদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) সনদ ও আন্তর্জাতিক বাজার
বাংলাদেশ প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্য হিসেবে জামদানির স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের জামদানিকে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়, নকল রুখতে এবং আসল জামদানি চেনার উপায় সম্পর্কে ক্রেতাদের সচেতন করা জরুরি।
উত্তরণের উপায়: টেকসই উদ্যোগের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, জামদানি শিল্পকে বাঁচাতে হলে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
-
সরাসরি বাজারজাতকরণ: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে তাঁতিদের সাথে ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা (যেমন ই-কমার্স ও মেলা) জোরদার করা।
-
সহজ শর্তে ঋণ: প্রান্তিক তাঁতিদের জন্য বিনাসূদে বা স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা।
-
প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়ন: ঐতিহ্য ধরে রেখে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে রঙের ব্যবহার ও পোশাকের ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনা।
শেষ কথা: জামদানি কেবল একটি পোশাক নয়, এটি আমাদের জাতিগত পরিচয়ের অংশ। এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকা। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব আমাদের এই সোনালী ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে চিরঅম্লান রাখা।
