![]()
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ, ঝটিকা মিছিল, চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এসব তৎপরতা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা মোকাবিলায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ সংবাদমাধ্যম যুগান্তরকে বলেন, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ ও প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়াই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এ ধরনের অপচেষ্টা সফল হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগামী দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, উদ্বেগ সংগীতাঙ্গনে
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে আলোচনায় এসেছে সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়িতে গুলির ঘটনা।
শনিবার ভোর ৫টার দিকে রাজধানীর মগবাজারে বিশাল সেন্টারের সামনে তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় এক দুর্বৃত্ত। গুলিতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। তবে ঘটনার সময় গাড়িতে আসিফ আকবর বা তার চালক কেউই ছিলেন না।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে এক ব্যক্তিকে নেমে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনাটি সংগীতাঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কুরিয়ার সার্ভিসে হামলা, মামলা তুলে নিতে হত্যার হুমকি
রাজধানীর হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে করা মামলার বাদী আফসার উদ্দিনকে মামলা তুলে নিতে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জমির মাসিক ভাড়া চার লাখ টাকা তাকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর কার্যালয় ও গুদামে হামলা চালিয়ে মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়।
মামলা করার পর আফসার উদ্দিনকে ফোন করে এক দিনের মধ্যে সমঝোতা না করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ব্যবহৃত সিমটি অন্য এক নারীর নামে নিবন্ধিত বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিম সংগ্রহের তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় প্রায় ৩১ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ হুমকির অডিও যাচাই করছে এবং পুরো ঘটনাটি তদন্তের আওতায় এনেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফোনে হুমকি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরিচয় গোপন রাখতে কেউ কেউ বিদেশি ভার্চুয়াল নম্বর, ভিপিএন এবং হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন। হুমকি দেওয়ার পর নম্বর বন্ধ করে দেওয়া বা অ্যাকাউন্টের পরিচয় আড়াল করার কারণে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের ছবি সম্পাদনা করে অপপ্রচার চালানো এবং মামলার তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
খুলনায় একের পর এক গুলির ঘটনা
খুলনা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি বেগম নামের এক তরুণীকে তার মায়ের সামনে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে আরেক ঘটনায় তুষার নামের এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। শনিবার তেরখাদা উপজেলায় এক স্থানীয় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করেও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনা ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, পুলিশি কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যেও বাড়ছে উদ্বেগ
ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করেছেন, বিজয়ের মাসকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগ ঘটাচ্ছে, নাকি সরকারের ভেতর থেকে ঘটানো হচ্ছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, ঘটনাগুলোর দায় কার—তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
পুলিশের বক্তব্য: আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা রুখতে অভিযান
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সংবাদমাধ্যম যুগান্তরকে বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, অপরাধ দমনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সময় পুলিশকে নানা ধরনের সমালোচনা ও চাপের মুখে পড়তে হয়। তারপরও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি কামারুম মুনিরা জানিয়েছেন, হুমকির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বর, বার্তা, অডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত যাচাই করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ জানানো এবং হুমকির বার্তা বা অডিও সংরক্ষণের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অপরাধ, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে একই পক্ষের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের ফল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।
