![]()
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের টানাপোড়েন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনঅসন্তোষ—সব মিলিয়ে নতুন এক সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর কর্মসংস্থান এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, দ্রব্যমূল্য ও দেশের শ্রমবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের নতুন প্রস্তাব
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। আল-জাজিরা, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির বিষয়ে এখন ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।
প্রস্তাবের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা ইরানি অর্থ ফেরত দেওয়া এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সামরিক সংঘাত বন্ধ করা।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্দির মতে, ইরান এই উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝাতে চাইছে যে, তারা কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিয়েছিল।
তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ইরান সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
অন্যদিকে, সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও দ্রুত কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আগ্রহী নন। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন সিনেটর ক্রিস মার্ফি। সরকারের কাছ থেকে গোপন নথি পাওয়ার পর তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
তার আশঙ্কা, মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান নীতির কারণে সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং তা বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু ইরান বা ইসরায়েল নয়, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব দেশের তেল-গ্যাসক্ষেত্র, জ্বালানি স্থাপনা এবং পানি শোধনাগার হামলার লক্ষ্যবস্তু হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে
মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে এসব দেশে শিল্পকারখানা, নির্মাণ খাত, জ্বালানি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। এতে অনেক বাংলাদেশি কর্মী চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারেন।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে। প্রবাসী আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী দেশে ফিরে এলে স্থানীয় শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নতুন করে বিপুলসংখ্যক কর্মপ্রার্থী যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংকট
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। তেহরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে বিদ্যমান চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে হবে এবং জব্দ করা অর্থ ফেরত দিতে হবে। এরপর অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও দেশটির বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হুমকির কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনও অনিশ্চিত।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রবাসী কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিও এসব বিষয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, রেমিট্যান্সের বিকল্প বাজার তৈরি, প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা এবং দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।
