![]()
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকারকে উপেক্ষা করে দেশ পরিচালনা করলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলা, ন্যায়বিচার পাওয়া, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের অধিকার খর্ব করার পরিণতি ভালো হয় না।
অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য
আলোচনায় দেশের অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে।
তিনি তৎকালীন রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তার দাবি, ওই বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল এবং জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয়েছিল। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা তাকে মুক্ত করেন। ওই সময় সাধারণ মানুষের একটি অংশ সিপাহিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিপাহিদের বিপ্লব এবং সাধারণ মানুষের সংহতির কারণেই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বর্তমান সরকার ও গণভোট নিয়ে সমালোচনা
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত।
তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি বাতিল করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পথ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তারেরও অভিযোগ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তার মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা তরুণদের প্রতি অবিচার।
বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে যা বললেন
সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ন্যায়সংগত বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে। তবে অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রতিবাদ জানানো হবে।
তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে।
র্যাবের কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য, শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হলে আলোচনা করে নতুন কাঠামো গঠন করতে হবে।
এ সময় জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সাত দফা দাবির কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব দাবি শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, বরং জনগণের অধিকার ও সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঐক্য ও সংস্কারের আহ্বান
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়; এটি একটি মানসিকতা। যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এমন মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের যেকোনো ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ওই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব।
জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা উচিত নয়।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের অধিকারবঞ্চিত হওয়ার বিষয়ও জড়িত ছিল।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
