![]()
নিউজ প্রোভাইডার
ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডের দেখা হয়েছে খুব বেশি বার নয়। কিন্তু যখনই এই দুই পরাশক্তি সবুজ গালিচায় একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই জন্ম নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং রোমহর্ষক সব ঘটনা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শুরু করে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড কিংবা ফুটবলের নিয়ম বদলে দেওয়া আন্তোনিও রাতিনের বহিষ্কার—এমন সব ঐতিহাসিক ঘটনাই এই দুই দেশের ফুটবলীয় বৈরিতাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য ও চিরন্তন মাত্রায়।
চলমান ফুটবল উন্মাদনার মাঝে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ৪টি বড় বিতর্কিত ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রাতিনের বহিষ্কার: যে ঘটনায় বদলে গেল ফুটবলের নিয়ম (১৯৬৬)
১৯৬৬ বিশ্বকাপের ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের গতিপথই বদলে দিয়েছিল। ম্যাচের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে ফুটবলের রেফারিং ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। খেলা চলাকালীন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে অসন্তোষ প্রকাশের দায়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন।
কিন্তু রেফারির ভাষা না বোঝায় রাতিন একজন দোভাষীর দাবি তোলেন এবং দীর্ঘ ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাঠ থেকে সরাতে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, তখন ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের কোনো প্রচলন ছিল না। এই ঐতিহাসিক ঘটনার পরই মূলত ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। কাকতালীয়ভাবে, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের লাইনআপ চূড়ান্ত হওয়ার দিনই ৮৯ বছর বয়সে ফুটবল ইতিহাসের এই কিংবদন্তি চরিত্র রাতিন শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
২. বার্তোনির ঘুষিতে ভাঙল চেরির দুটি দাঁত (১৯৭৭)
১৯৭৭ সালে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী লা বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দুই দলের একটি প্রীতি ম্যাচ। তবে নামের পাশে ‘প্রীতি’ শব্দ থাকলেও মাঠের লড়াই রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে। ম্যাচ শেষ হতে যখন মাত্র সাত মিনিট বাকি, তখন ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি পেছন থেকে আর্জেন্টিনার দানিয়েল বার্তোনিকে একটি কড়া ট্যাকল করেন।
বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নেননি বার্তোনি। তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি চেরির মুখে এক শক্তিশালী ঘুষি বসিয়ে দেন। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে চেরি আবিষ্কার করেন, তাঁর সামনের দুটি দাঁত ভেঙে গেছে! রেফারি অবলিম্বে দুজনকেই লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। আর দাঁত হারিয়ে চেরি নাম লেখান এক অনাকাঙ্ক্ষিত ইতিহাসে—আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের ইতিহাসে লাল কার্ড দেখা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হন তিনি।
৩. বেকহামের সেই বিখ্যাত লাল কার্ড ও সিমিওনের প্রতিশোধ (১৯৯৮)
দুই দলের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও আলোচিত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন ছিল ২–২ সমতা। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেছিলেন অ্যালান শিয়ারার ও মাইকেল ওয়েন, আর আর্জেন্টিনার পক্ষে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হাভিয়ের জানেত্তি।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার মাত্র দুই মিনিটের মাথায় আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনে পেছন থেকে ডেভিড বেকহামকে ফাউল করেন। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় ক্ষিপ্ত বেকহাম পা দিয়ে সিমিওনেকে আলতো আঘাত (প্রতিশোধ) করতে যান। সিমিওনে মাঠে নাটকীয়ভাবে লুটিয়ে পড়লে রেফারি বেকহামকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ১০ জনের ইংল্যান্ড ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। এই ঘটনার পর ইংল্যান্ডে খলনায়কে পরিণত হয়েছিলেন বেকহাম।
৪. পচেত্তিনোর ‘ডাইভ বিতর্ক’ ও বেকহামের জয়সূচক পেনাল্টি (২০০২)
১৯৯৮ সালের সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ হিসেবে ২০০২ বিশ্বকাপকে বেছে নেয় ইংল্যান্ড, তবে তা এক বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার মরিসিও পচেত্তিনো ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েনকে পেনাল্টি বক্সের ভেতর ফাউল করেছেন জানিয়ে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে বেকহাম ইংল্যান্ডকে জেতান এবং আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে টটেনহামের কোচ থাকাকালীন পচেত্তিনো এই বিষয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, “১৫ বছর আগে ওয়েন স্পষ্ট ডাইভ দিয়েছিল। ও যেন সুইমিংপুলে ঝাঁপ দিয়েছিল, আমি তাকে স্পর্শই করিনি। ইংলিশ ফুটবল সব সময় ন্যায্য—এটা বিশ্বাস করবেন না।” মজার ব্যাপার হলো, জাপানের হোক্কাইদোতে হওয়া সেই ম্যাচের রেফারি কলিনাই এখন ফিফার রেফারি–বিষয়ক কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
