![]()
নিউজ প্রোভাইডার
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম এক নারকীয় ও কলঙ্কিত অধ্যায়ের নাম শেরপুরের সোহাগপুর গণহত্যা। তবে প্রতি বছর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় দিবসটি স্মরণ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর চিত্র ভিন্ন। গত ২৫ জুলাই নীরবতার মধ্য দিয়েই পার হয়ে গেছে ঐতিহাসিক সোহাগপুর গণহত্যা দিবস। সরকারি কিংবা স্থানীয় কোনো মহলের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি কোনো স্মারক কর্মসূচি, নেওয়া হয়নি চরম আত্মত্যাগকারী বীরকন্যাদের কোনো খোঁজখবর।
১৯৭১-এর সেই কালো দিন ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই সকালে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন—এমন মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামটি ঘিরে ফেলে প্রায় ১৫০ জন পাকিস্তানি সেনা। প্রফুল্লের দিঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা জুড়ে শুরু হয় বর্বর তল্লাশি অভিযান।
গ্রাম রক্ষায় ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় আলী হোসেন ও জমির আলী। কিন্তু এক রাজাকারের বুলেটে ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়েন তাঁরা। এরপরই পুরো গ্রামে শুরু হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। মাঠে কর্মরত গারো আদিবাসী রমেন রিছিল, চটপাথাং ও সিরিল গাব্রিয়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একে একে জীবন দেন আনসার আলী, লতিফ মিয়া, ছফর উদ্দিন, শহর আলী, হযরত আলী, রিয়াজ আহমেদ, রহম আলী, সাহেব আলী, বাবর আলী, উমেদ আলী, আছমত আলী, মহেজ উদ্দিন ও সিরাজ আলীসহ নিরপরাধ গ্রামবাসী।
মাত্র দুই ঘণ্টার তাণ্ডবে গ্রামের ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই অনাথ হয় শত শিশু, আর স্বামী হারিয়ে বিধবা হন ৫৭ জন নারী। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন ১৩ জন নারী, যাঁদের মধ্যে ১২ জনকে পরবর্তীতে রাষ্ট্র ‘বীরঙ্গনা’ ও নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়। রক্তের দাগে ভেসে যাওয়া সেই ‘বিধবাপল্লী’ পরিচিতি পায় ‘বীরকন্যাপল্লী’ হিসেবে।
অবহেলা ও ক্ষতিগ্রস্ত ‘সৌরজায়া’ স্মৃতিসৌধ
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২২ সালে সোহাগপুরের বীরকন্যাদের আত্মত্যাগ ও শহীদদের স্মৃতি অম্লান রাখতে শেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘সৌরজায়া’ নামে একটি নান্দনিক স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। অতীতে প্রতিবছর এই দিনে স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে শোক র্যালি, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হতো।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে এই ঐতিহাসিক দিবসটি ঘিরে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিকতা চোখে পড়েনি। শুধু তা-ই নয়, হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে স্মৃতিসৌধ ‘সৌরজায়া’। স্থানীয় প্রশাসন বা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের পক্ষ থেকেও স্মৃতিসৌধটি সংস্কার কিংবা শহীদ পরিবারের খোঁজ নেওয়ার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সোহাগপুরের শহীদদের রক্ত ও বীরকন্যাদের ত্যাগ এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। চরম অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা এই ট্র্যাজেডির স্মৃতি রক্ষার্থে ক্ষতিগ্রস্ত ‘সৌরজায়া’ স্মৃতিসৌধ দ্রুত সংস্কার এবং জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
