![]()
শিশুদের ক্যানসার সৃষ্টির পেছনে সম্পূর্ণ অজানা ও অপ্রত্যাশিত একটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন নরওয়ের একদল বিজ্ঞানী। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ শিশুদের তুলনায় ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের শরীরে এমন কিছু অস্বাভাবিক ‘অটো-অ্যান্টিবডি’ (Auto-antibodies) তৈরি হয়, যা কোষের স্বাভাবিক ডিএনএ (DNA) মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ক্যানসার ধরা পড়ার কয়েক বছর আগে থেকেই শিশুদের রক্তে এই ক্ষতিকর অ্যান্টিবডিগুলো উচ্চমাত্রায় ভাসমান থাকে, যা ভবিষ্যতে শিশুদের ক্যানসারের আগাম স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
- 🧬 মূল আবিষ্কার: অস্বাভাবিক অটো-অ্যান্টিবডি কোষের ভেতর প্রবেশ করে ডিএনএ মেরামতকারী ৬টি মূল প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
- 🔬 প্রকাশনা: ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন-এর এই যুগান্তকারী গবেষণাটি স্বনামধন্য ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইমিউনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
- ⚠️ ঝুঁকির মাত্রা: যেসব শিশুর শরীরে এই অ্যান্টিবডি থাকে, তাদের ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি।
- 💡 ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: এই আবিষ্কারের ফলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া এবং শৈশবেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
শিশুদের ক্যানসার কেন বয়স্কদের চেয়ে আলাদা?
লিউকেমিয়া, মাইলোমা, নিউরোব্লাস্টোমা বা অস্টিওসারকোমার মতো শিশুদের ক্যানসারের কারণ, ধরন ও চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া বয়স্কদের ক্যানসারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত দূষণ, জীবনযাত্রা ও বার্ধক্যের কারণে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্যানসার দানা বাঁধে। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলোর সংস্পর্শে আসার সময় খুব কম থাকে। তাই শিশুদের ক্যানসারে মিউটেশন বা জিনের পরিবর্তন কম হয় এবং এগুলো মূলত স্টেম সেল বা অপরিণত কোষ থেকে তৈরি হয়। আর এখানেই অটো-অ্যান্টিবডির ভূমিকা বড় হয়ে দেখা দেয়।
ডিএনএ মেরামতে কীভাবে বাধা দেয় এই অ্যান্টিবডি?
ডা. ওলা মাইক্লেবোস্টের নেতৃত্বে গবেষক দলটি ১৭৫ জন ক্যানসার আক্রান্ত শিশু-তরুণ ও সুস্থ মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেন, ২ থেকে ১৯ বছর বয়সী ক্যানসার আক্রান্তদের রক্তে আইজিজি (IgG) শ্রেণির অ্যান্টিবডির মাত্রা অনেক বেশি। এই অটো-অ্যান্টিবডিগুলো ডিএনএ মেরামতের সাথে সরাসরি যুক্ত ৬টি প্রধান জিনকে (RAD52, NUMA1, ALKBH7, APBB1, UNG, এবং MGMT) লক্ষ্যবস্তু বানায়। কোষ বিভাজনের ঠিক আগে এই অ্যান্টিবডিগুলো কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ‘TIGER’ ডোমেইনে গিয়ে প্রোটিনগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। ফলে কোষ তার স্বাভাবিক ডিএনএ ত্রুটিগুলো আর মেরামত করতে পারে না, যা শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের রূপ নেয়।
আগাম স্ক্রিনিং ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেসব শিশুর রক্তে এই অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে, গড়ে ছয় বছর পর তাদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার সুস্থ শিশুদের তুলনায় আট গুণ বেশি। ডা. মাইক্লেবোস্ট ধারণা করছেন, কোনো সংক্রমণ (Infection), মাইক্রোবিয়াল প্রোটিনের ক্রস-রিয়্যাকশন কিংবা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার কারণেই শরীর ভুল করে এই অটো-অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে। এই আবিষ্কারটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কারণ, এখন অ্যান্টিবডি স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের ক্যানসারের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা এবং রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
এক নজরে গবেষণা ও আবিষ্কারের তথ্যচিত্র
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| প্রধান আবিষ্কার | অস্বাভাবিক অটো-অ্যান্টিবডি দ্বারা ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান |
| ক্ষতিগ্রস্ত মূল প্রোটিন/জিন | RAD52, NUMA1, ALKBH7, APBB1, UNG এবং MGMT |
| প্রধান গবেষক | ডা. ওলা মাইক্লেবোস্ট (মলিকুলার অনকোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক) |
| গবেষণা প্রতিষ্ঠান | ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন, নরওয়ে |
| প্রকাশিত জার্নাল | ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইমিউনোলজি (Frontiers in Immunology) |
| ক্যানসারের ধরন | লিউকেমিয়া, সারকোমা, মাইলোমা, নিউরোব্লাস্টোমা প্রভৃতি পেডিয়াট্রিক ক্যানসার |
