![]()
আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বেশ কিছু বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমার্জন ও পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকার পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণার বিশদ পটভূমি। আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান শাসন আমল মিলিয়ে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা দাঁড়িয়েছে তিন ধরনের।
- 📚 বইয়ের সংখ্যা ও ছাপা: প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ছাপা হচ্ছে প্রায় ৩১ কোটি বই।
- 🎖️ নতুন ইতিহাস বিষয়বস্তু: মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ৭ নভেম্বর ও নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে খালেদা জিয়ার অবদান।
- ✍️ জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ: সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধ পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
- 📘 ৪ নতুন বই: চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
তিন সরকারের আমলে পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার ৩ ভিন্ন বিবরণ
সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণে তিন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এসেছে ভিন্নতা:
- ২০২৭ সালের নতুন পাঠ্যবই: ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান “উই রিভল্ট” বলে কালুরঘাটে প্রতিরোধ গড়েন। রাত ২টা ১৫ মিনিটে (২৬শে মার্চ) স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির প্রধান হিসেবে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
- অন্তর্বর্তী সরকারের আমল (২০২৪-২০২৫): ২৬শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭শে মার্চ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও ঘোষণা প্রদান করেন।
- আওয়ামী লীগ আমল (২০২২): শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বলে উল্লেখ ছিল।
নতুন বিষয়বস্তু ও প্রাথমিক-মাধ্যমিকে যুক্ত হওয়া চার বই
ইতিহাস পাঠের পরিমার্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী দক্ষতায় উদ্বুদ্ধ করতে বাংলা ও আইসিটির বাইরে দুটি শ্রেণিতে চারটি একদম নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পাবে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ‘খেলাধুলা’ বিষয়ক বই। আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে কারিগরি শিক্ষার প্রতি প্রাথমিক ধারণা দিতে যুক্ত হচ্ছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও আনন্দের মাধ্যমে পাঠগ্রহণের জন্য ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
গবেষকদের মতামত: রাজনৈতিক চর্চা বনাম ইতিহাস চর্চা
পাঠ্যবইয়ে বারংবার ইতিহাস পরিবর্তনের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক আফসান চৌধুরী মন্তব্য করেছেন যে, সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস বদলে যাওয়ার নজির নতুন নয়। তাঁর মতে, আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস চর্চার চেয়ে রাজনৈতিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসই শেষ কথা নয়, সমাজের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও জনমানুষের ইতিহাস চর্চায় বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
৩ সরকারের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার তুলনা
| পর্যায় / সরকার | স্বাধীনতার ঘোষণার মূল বক্তব্য ও ধারা |
|---|---|
| আওয়ামী লীগ সরকার (২০২২) | ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক এককভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা। |
| অন্তর্বর্তী সরকার (২০২৫) | ২৬শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট কেন্দ্র থেকে ঘোষণা এবং ২৭শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনঃঘোষণা। |
| পরিমার্জিত পাঠ্যবই (২০২৭) | ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে মেজর জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভল্ট’ ও রাত ২:১৫-এ ঘোষণা। ২৭শে মার্চ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ও পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ঘোষণা। |
