![]()
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহত জান্নাতুল ফেরদৌসকে (২৮) হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম বিয়ের কথা গোপন রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দাম্পত্য বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এসব তথ্য জানান।
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে সাম্পান নৌকায় তুলে শিকলবাহা খালে নিয়ে যান তাঁর দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু। সেখানে সহযোগীদের নিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে লাশ খালে ফেলে দেওয়া হয়।
যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা
পিবিআই জানায়, জান্নাতুলের সঙ্গে রাজুর বিয়ে হয় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। বিয়ের সময় রাজু নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিলেও পরে জান্নাতুল জানতে পারেন, তাঁর স্বামীর প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাজু তাঁর পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে তাঁরা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। তাতেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজু জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ের ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে মুসলিম উদ্দিন, রাজুর প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরেক ব্যক্তি একটি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে তাঁরা সবাই নৌকায় উঠে কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকায় রাজুর সঙ্গে জান্নাতুলের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজু তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন এবং তাঁর মুখ চেপে ধরেন। এ সময় সহযোগীদের একজন ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। পরে রশি দিয়ে গলা পেঁচিয়ে জান্নাতুলকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাটে ফিরে যান। পরে আত্মগোপনে চলে যান আসামিরা।
যেভাবে শনাক্ত হয় লাশ
গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন নদী থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর লাশ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। তখন লাশটির হাত-পা বাঁধা ছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা সেটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় ভাড়া বাসায় রাজুর সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি।
এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
গ্রেপ্তার দুজন, তদন্ত চলছে
গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করেছে পিবিআই।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান।
প্রকাশক: Touch Bangla News
