![]()
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে শীর্ষ পদে থাকা একাধিক নারীর বিদায় ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ ও সমালোচনার মুখে কয়েকজন নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব হারালেও একই ধরনের বিতর্কে জড়ানো কিছু পুরুষ কর্মকর্তা পদে বহাল রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলের পদত্যাগের ঘটনা এ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। এর আগে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে গিলফয়েল অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
তিন মাসে চার নারী কর্মকর্তার বিদায়
চলতি বছরের বসন্তে প্রায় তিন মাসের ব্যবধানে ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রিসভা-পর্যায়ের চার নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব হারান বা পদত্যাগ করেন। তারা হলেন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি, শ্রমমন্ত্রী লরি শাভেজ-ডিরেমার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম এবং জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চারজনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুরুষ কর্মকর্তারা। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীদের অবস্থান এবং তাদের বিদায়ের কারণ নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
পাম বন্ডির বিরুদ্ধে জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের বিষয়টি সামাল দেওয়া এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে, কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ক্রিস্টি নোয়েম দাবি করেছিলেন, তাকে নিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন প্রচারে কয়েক কোটি ডলার ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার এই বক্তব্যও বিতর্কের জন্ম দেয়।
তুলসি গ্যাবার্ড পদত্যাগের ক্ষেত্রে স্বামীর দেখাশোনার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে তার মতপার্থক্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লরি শাভেজ-ডিরেমারের বিরুদ্ধে এক কর্মীর সঙ্গে অনুচিত সম্পর্ক এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এসব বিতর্কের মধ্যেই তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।
অভিযোগের মুখে থেকেও দায়িত্বে পুরুষ কর্মকর্তারা
ট্রাম্প প্রশাসনের পুরুষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব অভিযোগের পরও তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মদ্যপান, ব্যক্তিগত কাজে সরকারি উড়োজাহাজ ব্যবহার এবং তার বান্ধবীর নিরাপত্তায় বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের অভিযোগ রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের বিরুদ্ধেও জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ ও তার ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধেও সামরিক অভিযানের গোপন তথ্য বাণিজ্যিক বার্তা আদান-প্রদানের একটি গ্রুপে প্রকাশ করার অভিযোগ উঠেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্বে রয়েছেন।
একই গ্রুপে একজন সাংবাদিককে যুক্ত করার ঘটনায় সমালোচিত হয়েছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ। পরে তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত করা হয়।
সমালোচকদের মতে, বিতর্কের মুখে পুরুষ কর্মকর্তাদের দায়িত্বে বহাল থাকা কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে নারী কর্মকর্তাদের দ্রুত বিদায়ের তুলনা করেই বৈষম্যের প্রশ্ন উঠছে।
নারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কি কঠোর ব্যবস্থা?
ট্রাম্প প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা।
টেক্সাসের প্রতিনিধি জেসমিন ক্রকেটের অভিযোগ, সমস্যায় পড়া পুরুষ কর্মকর্তাদের তুলনায় নারী কর্মকর্তাদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে প্রশাসনে।
পেনসিলভানিয়ার প্রতিনিধি ম্যাডেলিন ডিনও হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বক্তব্য, এপস্টিনের সহযোগীদের জবাবদিহির বিষয়ে ট্রাম্প সত্যিই আন্তরিক হলে লুটনিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় হোয়াইট হাউস। তাদের বক্তব্য, কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে লিঙ্গ নয়, বরং যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য কী?
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইন্ডিপেনডেন্ট উইমেনস ল সেন্টারের পরিচালক মে মেইলম্যানও প্রশাসনে নারীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নারী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকার বিভাগের প্রধান হারমিত ঢিলন।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, কয়েকজন নারী কর্মকর্তার বিদায়কে পুরো প্রশাসনে নারীদের অবস্থানের একমাত্র চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
জবাবদিহি ও সমতার প্রশ্ন
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নারী কর্মকর্তার দ্রুত বিদায় এবং বিতর্কের মুখে থাকা কিছু পুরুষ কর্মকর্তার দায়িত্বে বহাল থাকার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এক পক্ষের অভিযোগ, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ কর্মকর্তাদের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস বলছে, নিয়োগ ও দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্তে লিঙ্গের কোনো ভূমিকা নেই।
শেষ পর্যন্ত এসব সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা, কর্মদক্ষতা নাকি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কাজ করছে—তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
